সুদানের দক্ষিণ দারফুরের নিয়ালা শহরের একটি ব্যস্ত বাজারে ড্রোন হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির মানবাধিকার সংগঠন ইমার্জেন্সি লয়ার্স। নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তবে বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া হতাহতের সংখ্যায় বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় প্রকৃত প্রাণহানি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে নিয়ালা শহরের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বাজারে হামলাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেখানে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার সময় বাজারে বিপুলসংখ্যক মানুষ ছিলেন। সেখানে সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে আরএসএফ সদস্যরাও জড়ো হয়েছিলেন।
একজন সিগারেট বিক্রেতার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর বাজারে আরএসএফ সদস্যদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। রাত ৮টার দিকে ড্রোন আঘাত হানলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
হামলায় সশস্ত্র সদস্যদের পাশাপাশি খাবার বিক্রি করা নারীরাও প্রাণ হারান বলে জানান তিনি।
অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী বিস্ফোরণকে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চা ও খাবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক নারী ও শিশু হামলার শিকার হয়েছেন।
নিয়ালা শহরটি আরএসএফের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে শহরটি দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুদানের সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংগঠন ইমার্জেন্সি লয়ার্স জানিয়েছে, সোমবারের হামলায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১১৩ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক প্রাথমিকভাবে অন্তত ২১ জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হওয়ার তথ্য জানায়।
সংগঠনটি বলেছে, নিরাপত্তাঝুঁকি ও চলমান সামরিক অভিযানের কারণে ঘটনাস্থল থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করতে বিলম্ব হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা সংস্থা মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, তাদের সহায়তাপুষ্ট নিয়ালা টিচিং হাসপাতালে হামলার পর ৩৬টি মরদেহ আনা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ২১ জন বেসামরিক পোশাক পরা ছিলেন।
এ ছাড়া হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে ১৫০ জনের বেশি আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এই পরিসংখ্যানগুলো ভিন্ন উৎস ও গণনাপদ্ধতির ভিত্তিতে প্রকাশিত। তাই ৩৬টি মরদেহ হাসপাতালে পৌঁছানোর তথ্যকে হামলায় মোট নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা হিসেবে ধরা যাচ্ছে না।
হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে ইমার্জেন্সি লয়ার্স। এমএসএফও তাদের বিবৃতিতে হামলাটি সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর ড্রোন থেকে চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে।
অন্যদিকে সেনাবাহিনীর পক্ষে লড়াই করা স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেসের মুখপাত্র মোহামেদ দিদান ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন।
তাঁর দাবি, নিয়ালার পশ্চিমে দুমাইয়া ক্যাম্পে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়ে ১৫০ জনের বেশি মিলিশিয়া সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে তাঁর দেওয়া সংখ্যার সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন ও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর তথ্যের মিল নেই।
হামলায় কতজন বেসামরিক নাগরিক এবং কতজন সশস্ত্র সদস্য নিহত হয়েছেন, তা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
দারফুরে কর্মরত ত্রাণকর্মী মোবারক বেখেত চলমান সংঘাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি যে যুদ্ধের কোনো নৈতিকতা নেই, তবে আমরা প্রতিদিন যে বাস্তবতার মুখোমুখি হই তা হলো বেসামরিক মানুষই সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে। তারা তাদের জীবন, প্রিয়জন এবং ঘরবাড়ি হারাচ্ছে এবং আরও বোমাবর্ষণের ক্রমাগত ভয়ের মধ্যে বাস করছে।’
হামলার পর বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এমএসএফ।
সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাজার, ঘরবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো কোনো লক্ষ্যবস্তু নয়। সংঘাতের সমস্ত পক্ষকে অবশ্যই বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে।’
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে হামলার পাশাপাশি কাছাকাছি একটি আবাসিক এলাকাতেও দ্বিতীয় ড্রোন হামলা হয়েছে।
সুদানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের সংঘাতের মধ্যে ড্রোন হামলা বেসামরিক মানুষের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে বেসামরিক প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ ধরনের হামলা।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে সুদানের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্যাভাব তীব্র হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষ করে দারফুরে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকট একসঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যস্ত বাজারে ড্রোন হামলার ঘটনা বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সূত্র : আল জাজিরা।
মন্তব্যসমূহ