যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি নতুন যুদ্ধবিরতি খসড়া প্রস্তাব পেশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার। তবে প্রস্তাবটির গ্রহণযোগ্যতা ও কাঠামো নিয়ে তেহরান ও মধ্যস্থতাকারীদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে তীব্র মতবিরোধ ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রকাশ্যে এসেছে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, গত রবিবার ইরানের কাছে আনুষ্ঠানিক শান্তি প্রস্তাবটি হস্তান্তর করা হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ তেহরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশা করছে দোহা। তবে প্রস্তাবটিকে পুরোপুরি নাকচ করে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কাতার কেবল কিছু ‘অগ্রহণযোগ্য ধারণা’ উপস্থাপন করেছে, যা কোনোভাবেই আলোচনার যোগ্য আনুষ্ঠানিক বা ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব হতে পারে না।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, উভয় পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনে সাত দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হয়েছে। এই সময়সীমার আওতায় প্রতিদিন উভয় পক্ষ আস্থা তৈরির কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ (Confidence-Building Measures) বাস্তবায়ন করবে, যা আগামী সপ্তাহের শুরুতে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তিটি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে কয়েকটি প্রভাবশালী দেশকে ‘গ্যারান্টর’ বা জামিনদার হিসেবে রাখারও বিধান রাখা হয়েছে।
তবে পরমাণু কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরান নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় সমঝোতার পথ জটিল হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সক্ষমতা সীমিত করার বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিপরীতে তেহরানের স্পষ্ট শর্ত—আলোচনা শুরু করতে হলে আগে ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং দেশটির জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে হবে। সামরিক উদ্দেশ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার পশ্চিমা অভিযোগ ইরান যথারীতি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার সমান্তরালে রণক্ষেত্রে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির মারাত্মক শঙ্কা বিরাজ করছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় পুনরায় বিমান হামলার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এর জবাবে ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবার আগ্রাসন চালায়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রতলের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কেবল (Subsea Internet & Telecom Cables) লক্ষ্য করে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানার পূর্ণ সামরিক ছক চূড়ান্ত করেছে তেহরান।
উত্তেজনা প্রশমনে আঞ্চলিক পর্যায়েও তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা তেহরানে ইরানি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। এর আগে মঙ্গলবার মধ্যস্থতাকারী কাতার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করে, কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইরানকে অবিলম্বে উপসাগরীয় প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে হবে।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া তুমুল লড়াই এবং উপসাগরীয় অবকাঠামোতে ধারাবাহিক আঘাতের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে এক বহুমুখী যুদ্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে এই সংঘাত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জনসমর্থনেও বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ তৈরি করেছে।
মন্তব্যসমূহ