খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম ও সীমিত আয়ের কারণে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ায় জাতীয় সংসদে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়নের বিষয়টি উত্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত ‘ক্ষুধার সঙ্গে আপস নয় : খাদ্যমূল্যস্ফীতি’ শীর্ষক গণশুনানি ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আবু সুফিয়ান।
তিনি জানান, সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের সুফল অচিরেই জনগণ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া গার্মেন্টসকর্মী, রিকশাচালক, হকার, ফুড ডেলিভারি কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের খাদ্যসংকটের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এতে পরিবারের খাবারের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের দাবি জানান গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারীরা। তারা মনে করেন, সীমিত আয় ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, গত চার বছরে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ বেড়েছে। এর মধ্যে গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। এ ছাড়া প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানানো হয়। বক্তারা বলেন, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হচ্ছে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষকে।
বক্তাদের মতে, খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে খাদ্যসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে সমন্বিত খাদ্য অধিকার আইন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
সভাপতির বক্তব্যে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও আইএসডিই বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইন বলেন, খাদ্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকলেই মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত হয় না। সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যকে দাতব্য সহায়তার বিষয় হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও নাগরিকের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি বাংলাদেশ, আইএসডিই বাংলাদেশ এবং পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (প্রাণ) সহযোগিতায় গণশুনানির আয়োজন করা হয়। যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আবু হানিফ নোমান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট কলামিস্ট মুসা খান, ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সম্পাদক মো. সেলিম জাহাঙ্গীর, রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী মিটুল দাস গুপ্ত, নারী নেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস, সবুজের যাত্রার নির্বাহী পরিচালক সায়েরা বেগম, ক্যাব চান্দগাঁও থানা সভাপতি মো. জানে আলম এবং পাঁচলাইশ থানা সভাপতি এ বি এম হুমায়ুন কবিরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
মন্তব্যসমূহ