চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় আবারও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত নিরসনে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি দাবি করেছেন, তাঁকে পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নরওয়ের জন্য দীর্ঘস্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিরাকিউজে এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে এবারের পুরস্কারজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের অবদান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্যে পিল্লাইকে রহস্যময় ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তিনি কী করেছেন, সে সম্পর্কে তাঁর জানা নেই। যুক্তরাষ্ট্রকে নোবেল শান্তি পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি ভুলে যাওয়া হবে না বলেও নরওয়ের উদ্দেশে মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত একটি পোস্টেও নোবেল না পাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ জানান ট্রাম্প।
পোস্টে তিনি দাবি করেন, তাঁর উদ্যোগে আটটি যুদ্ধের অবসান হয়েছে এবং আরও দুটি সংঘাত সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো এবং ভেনেজুয়েলায় একজন কর্তৃত্ববাদী নেতাকে আটক করার বিষয়ও নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের আটটি সংঘাতের অবসান ঘটানোর দাবি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়। কয়েকটি সংঘাতের সমাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট দেশ ও অন্য পক্ষগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি জানিয়েছে, শান্তি পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্তে নরওয়ে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই।
শনিবার কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেন, আলফ্রেড নোবেলের উইলে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেই বিজয়ী নির্বাচন করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়াই কমিটির উদ্দেশ্য।
এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই। জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার পিল্লাই দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে কাজ করছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিল্লাই।
গত বছর গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড তদন্তে জাতিসংঘের একটি কমিশনের নেতৃত্ব দেন তিনি। কমিশনটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলে। তবে ইসরায়েল সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নোবেল পাওয়ার পর যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের উদ্দেশে পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন পিল্লাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনাও করেন তিনি।
এদিকে পিল্লাইয়ের নোবেল জয়ের ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে এমন আদালতের কার্যক্রম প্রতিরোধ করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলো মনে করেন, একই দিনে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা ও আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।
এর আগে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তি ও দেশ প্রচার চালিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের বিজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিজের নোবেল পদক ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন।
তবে নোবেল কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, একবার ঘোষিত পুরস্কার বাতিল, অন্যের সঙ্গে ভাগ কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা যায় না।
সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট
মন্তব্যসমূহ