মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের কয়েকটি শহরে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব আরও গভীরভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে মার্কিন বাহিনী ইরানের কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে এবং ইরান জর্ডানে এক মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহরে হামলা চালায়। এতে ৭৩ জন আহত হন এবং তেল স্থাপনাগুলোতে আগুন ধরে যায়। ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের বিস্তার বলে মনে করা হচ্ছে।
সৌদিতে হামলার খবরের মধ্যে যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছিল, তখন মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, তারা ইরানের পাঁচটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে। হামলার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে তারা। মার্কিন বাহিনী জানায়, গত দুই দিনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দুবার এক মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্য করার পর এই হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এসব ঘটনায় কোনো মার্কিন নাগরিক আহত বা নিহত হননি।
লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘ইরান মার্কিন নৌজাহাজে আঘাত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা যতবার এটি করবে বা করার চেষ্টা করবে, ততবার তাদের ট্যাংকার হারাতে হবে।’
এরপর ইরান পাল্টা জবাব দেয়। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, তারা জর্ডানের আল-আজরাকের কাছে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ওই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এমন ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে জর্ডানের দিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
ইরান দাবি করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ভূপাতিত করেছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। জর্ডান আরও জানিয়েছে, এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পুরো যুদ্ধজুড়েই ইরান এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। জর্ডানও এর আগে বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হয়েছে। জুলাই মাসে একটি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন।
আইআরজিসির আরেক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা দুটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারেও হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই তথ্য জানিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী তখনও এই দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতেও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই হুমকি দেওয়া হয়।
এদিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এর জন্য কারা দায়ী, তা স্পষ্ট নয়।
অপরদিকে, ইয়েমেনের জনবহুল এলাকার অধিকাংশ, রাজধানীসহ, নিয়ন্ত্রণ করে হুতিরা। তারা আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে, লোহিত সাগরের প্রবেশপথে, মাঝেমধ্যে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে। মঙ্গলবার হুতিরা জানায়, তারা সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে একটি বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের একটি সৌদি বিমানঘাঁটি এবং আবহা, নাজরান ও জাজান শহরে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
নাসার স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে জাজান রিফাইনারির ওপর ঘন কালো ধোঁয়ার মেঘ দেখা গেছে। আবহায় একটি তেল বিতরণকেন্দ্র থেকে সাদা ধোঁয়ার একটি স্তম্ভও উঠতে দেখা গেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব স্থাপনায় আগুন লেগেছে। তারা আরও জানিয়েছে, আহত ৭৩ জনের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। এত বেশি মানুষের আহত হওয়ার খবর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর সৌদি আরবের ওপর চালানো হামলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বড় হামলা।
সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুতিদের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালির বাইরেও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।
হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী থেকে দেশটির সরকারকে উৎখাত করার পর সৌদি আরব এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই যুদ্ধ কিছুটা শান্ত হয়েছিল। তবে সেখানে যে যুদ্ধবিরতি ছিল, সেটি ভেঙে পড়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এই বৃহত্তর যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শক্তি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষই আশা করছে, একে অপরের ওপর আরোপ করা অর্থনৈতিক অবরোধ শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে।
যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি হয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার ধ্বংস করা তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এমন একটি গোপন নেটওয়ার্কের অংশ ছিল, যেটি আইআরজিসি এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের অর্থায়ন করে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভাষায় একটি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’কে সমর্থন করে আসছে। এই জোটের মধ্যে রয়েছে হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এবং ইয়েমেনের হুতিরা।