নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো তিন হাজারের বেশি মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং নদীর পানি বৃদ্ধির মধ্যেই নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
রোববার (৩০ আগস্ট) নেপাল ও চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ৭৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটিতে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৪৯৮ জন।
অন্যদিকে চীনের তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪৬ জন। তাদের মধ্যে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
দুই দেশের হিসাব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৭৫০ জনের মৃত্যু এবং ৩ হাজার ৪৪ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত বুধবার হিমালয়ের উঁচু এলাকায় একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীপথ দিয়ে নিচে নেমে আসে। এতে নেপালের রাসুওয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংসহ বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিব্বতের গিরং সীমান্ত এলাকাতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে।
নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিক রয়েছেন। কয়েকটি প্রকল্পের টানেলের ভেতরে শতাধিক শ্রমিক এখনো আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার অভিযান চলছে ত্রিশুলি ৩এ ও ৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায়। শনিবার রাতে সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল কাদা ও ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি টানেলের ওপরের অংশে ড্রিল করে ভেতরে পাইপ প্রবেশ করায়। ওই পাইপ দিয়ে বাতাস পাঠানোর পাশাপাশি ক্যামেরার মাধ্যমে ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে রাতভর বৃষ্টি এবং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় রোববার সকালে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে আবার কাজ শুরু করেন উদ্ধারকর্মীরা।
জটিল টানেল উদ্ধার অভিযানে নেপালকে সহায়তা করছে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞ দল। একই সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ শনাক্তকরণ এবং বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জামের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে কাঠমান্ডু।
বিপর্যস্ত এলাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তিব্বত সীমান্তের কাছে আগের একটি অস্থায়ী হ্রদের পানি অনেকটা নেমে গেলেও শনিবারের নতুন ভূমিধসে প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দূরে আরেকটি বাঁধসদৃশ প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। সেখানে পানি জমতে শুরু করায় নিচু এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকর্মীদের কিছু এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। নেপালেও ত্রিশুলি নদীসহ কয়েকটি নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দল ও নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রেড ক্রসের হিসাবে নেপালে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
দুর্যোগের প্রকৃত কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ চালাচ্ছেন। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে হিমবাহের অস্থিতিশীলতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীনা বিজ্ঞানীদের মূল্যায়নে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার সঙ্গে এ বিপর্যয়ের সম্পর্ক থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যে নেপালের জন্য জরুরি সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা প্রত্যেকে প্রায় ৩৬ লাখ ডলার, যুক্তরাজ্য ৬৮ লাখ ডলার এবং জাতিসংঘ ২৫ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ২৩ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন ১০ লাখ ডলারের বেশি জরুরি অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।
নেপাল সরকার বলছে, এখন তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করে পুনর্গঠন শুরু করা হবে। বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের কারণে দেশটির পুনর্গঠনে কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ