পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের চাপ বাড়ছে। একের পর এক জাহাজ মোতায়েন, ফিলিপাইনের নৌযানে বাধা এবং বিতর্কিত এলাকায় টহল নিয়ে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু ছবি, ভিডিও আর প্রতিবেদন প্রকাশ করে চীনকে থামানো যাবে না বলে মনে করছে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ি ইনস্টিটিউট। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনকে এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে হবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে।
পালাওয়ান প্রদেশের ফিলিপাইন-নিয়ন্ত্রিত কোটা দ্বীপের কাছে চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার জাহাজ ৯৬২২ আবারও ফিরে এসেছে। এর সঙ্গে ছিল ২২টি ছোট নৌযান। ফিলিপাইনের অভিযোগ, এসব নৌযান অনুমতি ছাড়া মাছ ধরেছে এবং সমুদ্রে বর্জ্য ফেলেছে। পরে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড ও নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলোকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে।
এর কয়েক দিন আগেই আয়ুঙ্গিন শোলে আরও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ফিলিপাইনের একটি চিকিৎসা ও উদ্ধার মিশনের সময় চীনা কোস্টগার্ড জলকামান ব্যবহার করে বলে ফিলিপাইন জানিয়েছে। মিশনটির লক্ষ্য ছিল সেখানে অবস্থানরত ফিলিপাইনের সেনাদের একজনকে সরিয়ে নেওয়া।
আয়ুঙ্গিন শোলে থাকা বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে শুধু একটি পুরোনো জাহাজ নয়। ১৯৯৯ সালে ফিলিপাইন ইচ্ছাকৃতভাবে জাহাজটি সেখানে স্থাপন করে। এরপর থেকে এটি ওই এলাকায় ফিলিপাইনের উপস্থিতির প্রতীক হয়ে আছে।
উত্তেজনা এখানেই থামেনি।
২৫ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনের একটি রোটেশন ও রসদ সরবরাহ মিশনে চীনা কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী বাধা দেয় বলে অভিযোগ করেছে ম্যানিলা। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনের বেসামরিক জাহাজ বিআরপি দাতু মাগাত সালামাত চীনা কোস্টগার্ডের একটি জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে চীনা জাহাজের উপস্থিতি বৃদ্ধিতে।
ফিলিপাইনের হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ৫৬টি চীনা নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড জাহাজ শনাক্ত হয়েছিল। পরের মাসে এই সংখ্যা বেড়ে ১০১-এ পৌঁছায় বলে লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে চীনের সামুদ্রিক উপস্থিতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এখানেই ফিলিপাইনের তথাকথিত ‘স্বচ্ছতা কৌশল’ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
চীনা জাহাজ কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ফিলিপাইনের নৌযানের সঙ্গে আচরণ করছে, এসবের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করছে ম্যানিলা। এতে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি দৃশ্যমান হচ্ছে। ২০১৬ সালের দক্ষিণ চীন সাগরবিষয়ক সালিশি রায়ের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখতেও এই কৌশল কাজে লাগছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, চীনের আচরণ এখনো থামেনি।
তাই শুধু ঘটনা প্রকাশ নয়, প্রতিরোধের বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় ইতোমধ্যে সামরিক ঘাঁটি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া, দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে প্রতিরক্ষায় কাজে লাগানোর বিষয় রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা।
কারণ, চীনের মতো বড় সামরিক শক্তির সঙ্গে একা পাল্লা দেওয়া ফিলিপাইনের জন্য কঠিন। তাই মিত্রদের সঙ্গে ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ, অস্ত্র মোতায়েন এবং সামরিক সম্পদের সমন্বয় নিয়ে আরও স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তবে লড়াই শুধু সমুদ্রে নয়।
ডিজিটাল দুনিয়াতেও চলছে আরেক ধরনের প্রতিযোগিতা।
চীন ফিলিপাইনকে ঘিরে নিজেদের বয়ান শক্তিশালী করতে ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা, ফিলিপাইনের স্বাধীনতার গুরুত্ব খাটো করে দেখানো এবং চীনের উন্নয়ন প্রকল্পকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার মতো তথ্য প্রচার করছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে ফিলিপাইনের জন্য সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি তথ্যযুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য মোকাবিলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের বক্তব্য ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আসিয়ান।
২০২৬ সালে আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে ফিলিপাইন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তের মতো আঞ্চলিক সংকটে আসিয়ানের ভূমিকা আরও কার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে দেশটি।
তবে এখানেও বড় প্রশ্ন রয়েছে।
আসিয়ানের ঐকমত্য ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার পুরোনো নীতি বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কতটা কার্যকর, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়। লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ বলছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আসিয়ানের নীতিগত সক্ষমতাও নতুন করে ভাবতে হবে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ফিলিপাইনের জন্য শুধু একটি সামুদ্রিক বিরোধ নয়। এটি এখন প্রতিরক্ষা, কূটনীতি, তথ্যযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে বিশ্বকে পরিস্থিতি জানানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাতে যদি মাঠের বাস্তবতা না বদলায়, তাহলে সেটি একা যথেষ্ট নয়।
ফিলিপাইনের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই, চীনের চাপের বিরুদ্ধে দৃশ্যমানতার পর এবার কি কার্যকর প্রতিরোধ দেখাতে পারবে ম্যানিলা?
মন্তব্যসমূহ