ইরানকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কাছে ‘নতুন, সৃজনশীল ও অপ্রচলিত’ কৌশলের ধারণা চেয়েছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে দুটি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সেন্টকমের গোয়েন্দা শাখার ওই কর্মকর্তা গত বুধবার সামরিক বিশ্লেষকদের একটি বড় দলের কাছে পাঠানো ই-মেইলে লেখেন, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি ও দেশটিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নতুন এবং অভিনব উপায় খোঁজা হচ্ছে।
বার্তাটি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দ্বিতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ইরানকে মোকাবিলার নতুন উপায় জানতে এ ধরনের বার্তা পাঠিয়েছেন।
সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ই-মেইলের মাধ্যমে বড় পরিসরে সবার কাছ থেকে কৌশলগত ধারণা চাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে চুক্তিতে রাজি করাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে থাকা বিকল্প সীমিত এবং সেগুলোর অনেকগুলো গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
দ্বিতীয় সূত্রটি জানায়, সেন্টকম সম্ভাব্য সব বিকল্প পর্যালোচনা করছে এবং বিদ্যমান কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের উদ্ভাবনী চিন্তা ও কার্যক্রমের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার পদমর্যাদা নির্বিশেষে দলের সদস্যদের কাছ থেকে মতামত গ্রহণ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানে নতুন করে হামলার হুমকি দেওয়ার আগেই ওই ই-মেইল পাঠানো হয়েছিল। তবে শনিবার আঞ্চলিক নেতাদের হস্তক্ষেপের পর তিনি পরিকল্পিত হামলা থেকে সরে আসেন। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান টেলিফোনে ট্রাম্পকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সক্ষমতা কমানো এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর লক্ষ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে বিমান হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখনো কোনো চুক্তির লক্ষণ দেখা যায়নি।
হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার প্রস্তুতি বিবেচনা করছে। এসব স্থানে পারমাণবিক কর্মসূচির উপাদান বা সরঞ্জাম থাকতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা।
সূত্রগুলোর মতে, স্থাপনাগুলো মাটির গভীরে অবস্থিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। এগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করতে স্থলসেনা ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে, যা ঝুঁকিপূর্ণ এবং ট্রাম্প এমন পদক্ষেপে অনিচ্ছুক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এমন একটি প্রতীকী হামলার কথাও বিবেচনা করছেন, যা দৃশ্যত বড় সামরিক অভিযানের মতো মনে হবে। এতে আগে হামলা করা অথবা কাছাকাছি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হতে পারে। এর মাধ্যমে প্রতীকী বিজয় দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ কিংবা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটের সমাধান নাও হতে পারে।
যুদ্ধ পরিকল্পনার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইবেন। প্রচলিত বিকল্পগুলো ফুরিয়ে এলে নতুন ও সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োজন দেখা দেয়।
সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সিআইএ ও ডিআইএর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বোমা হামলা আলোচনায় ইরানের অবস্থান পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে নাও পারে।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও প্রকাশ্যে বলেছেন, কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে ট্রাম্পের ঘোষিত সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেন্টকমের একটি পরিকল্পনায় এক থেকে দুই সপ্তাহ ধরে ব্যাপক বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত এ পদক্ষেপ অনুমোদন করেননি।
এর একটি কারণ হিসেবে বিমান প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা আরও সতর্ক করেছেন, সেতু ও পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনার মতো অবকাঠামোয় হামলা চালানো হলে ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হবে।
শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জয় চায় এবং ইরান হামলা সহ্য করতে না পারার কথা বলা পর্যন্ত কঠোর আঘাত অব্যাহত রাখা হবে।
সূত্র: সিএনএন