ইসরায়েলের পার্লামেন্টে নতুন সরকার গঠনের সাংবিধানিক দায়িত্ব কার কাঁধে অর্পণ করা হবে, সে বিষয়ে রোববার (৮ নভেম্বর ২০২৬) আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তুলনায় বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাওয়ায় এই প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো পার্লামেন্টের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা সম্পন্ন করেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট—কোনো নেতাই একক শক্তিতে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার নিশ্চিত করতে পারেননি।
ইসরায়েলের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী সরকার গঠনের প্রথম ম্যান্ডেট দেওয়ার চূড়ান্ত এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির হাতে থাকলেও ঐতিহ্যগতভাবে পার্লামেন্টের সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্যের সমর্থন পাওয়া ব্যক্তিকেই এই সুযোগ দেওয়া হয়। এবারের পরামর্শ সভায় নেসেটের ১২০ জন নির্বাচিত এমপির মধ্যে ৬৭ জন সদস্য আইজেনকটকে এবং ৪৬ জন সদস্য নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রী করার পক্ষে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছেন, আর বাকি সাতজন সদস্য কোনো পক্ষকেই সমর্থন না দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছেন। তবে পরামর্শ সভার স্পষ্ট ফলাফল সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট হারজগ বৃহস্পতিবার এক সতর্ক বার্তায় উল্লেখ করেন যে, আইন অনুযায়ী শুধু সংখ্যাধিক্য নয়, বরং সরকার গঠনের বাস্তব সক্ষমতা কার রয়েছে তা যাচাইয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। উভয় শিবিরের শরিকদের মধ্যকার তীব্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয় জানিয়ে তিনি কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আরও কিছু ব্যক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইজেনকটের দল ‘ইয়াশার’ এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইসরায়েলের জনগণ দীর্ঘদিনের যুদ্ধবাজ শাসনের অবসান ও পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, তাই দ্রুত একটি জাতীয় জরুরি সরকার গঠন অপরিহার্য।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলো, যারা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে দুটি প্রধান জোটের অধীনে রেকর্ড ১৯টি আসন লাভ করেছে। বৃহস্পতিবার আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ উভয় দলই আনুষ্ঠানিকভাবে আইজেনকটকে সমর্থনের কথা জানালেও সরকারে তাদের সরাসরি অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়ে গেছে। বিশেষ করে আইজেনকটের সম্ভাব্য জোটের অন্যতম শরিক কট্টর ডানপন্থী দল ‘ইসরাইল বেইতেনু’-এর প্রধান আভিগদর লিবারম্যান আগেই সাফ জানিয়েছেন যে আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারের অংশ তিনি হবেন না। অতীতে নেতানিয়াহুর সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী থাকা লিবারম্যানের মূল আপত্তি হলো আরব দলগুলো হামাসকে স্পষ্টভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেয় না, যদিও দলগুলো ইতিপূর্বে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছিল।
অন্যদিকে গত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে থাকা কট্টর ইহুদি ধর্মীয় দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ এবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহুর পক্ষে কোনো সুপারিশ করেনি, আবার আইজেনকটকেও সমর্থন দেয়নি। নেসেটে সাতটি আসন পাওয়া এই দলটির এমন নিরপেক্ষ অবস্থানের মূল কারণ হলো অতি-গোঁড়া ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহতি নিশ্চিত করার আইনগত নিশ্চয়তা না পাওয়া। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সাধারণ ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনাদের পরিবার যখন ক্ষুব্ধ, তখন নেতানিয়াহুর পক্ষে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া আইনগতভাবে পাস করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আইজেনকট ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের এই সামরিক অব্যাহতি পুরোপুরি বাতিলের পক্ষে কঠোর অবস্থানে অনড় রয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট হারজগ যাকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দেবেন, তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে ২৮ দিন সময় পাবেন এবং প্রয়োজনে তা আরও ১৪ দিন বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। নির্ধারিত এই মেয়াদের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো নেতাকে পুনরায় সুযোগ দেবেন। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট মোট ৫৩টি আসন পেয়েছে এবং আইজেনকটের মধ্যপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব দলগুলোর বিপুল জয়ের পেছনে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও নেতানিয়াহু সরকারের উগ্র নীতির ক্ষোভ কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধীদের রাজনৈতিক সমঝোতাকে নেতানিয়াহু ‘বিদেশি অর্থে পরিচালিত ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে সাধারণ আরব নাগরিকদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলায় দেশটিতে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মেরুকরণ চরম আকার ধারণ করেছে।
সূত্র: এনডিটিভি














মন্তব্যসমূহ