শুটিং সেটে মারধরের অভিযোগ ঘিরে অভিনেত্রী তানজিন তিশা ও সামিয়া অথৈর মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে তাদের সদস্যপদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশ। বিরোধ নিষ্পত্তিতে একাধিকবার আলোচনা ও সালিসের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমঝোতা না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটির কার্যনির্বাহী পরিষদ।
গত ৪ অক্টোবর দুই অভিনেত্রীর কাছে পৃথক চিঠি পাঠিয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৭ জুলাই তানজিন নাহার তিশা ও সামিয়া আক্তার অথৈকে সদস্যপদ স্থগিতের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের কেউই সংগঠনের কার্যালয়ে লিখিত জবাব জমা দেননি।
চিঠি অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের সালিস বা বিবাদ মীমাংসাকরণ বৈঠকে আলোচনা হয়। সেখানে নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কার্যনির্বাহী পরিষদের নিয়মিত সভায় দুই অভিনেত্রীর সদস্যপদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা মিঠু।
সিদ্ধান্তের পেছনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু বলেন, ‘অভিনয়শিল্পী সংঘের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য একটি সালিস কমিটি আছে, যা সার্বভৌম এবং স্বাধীন।
আমরা চেয়েছিলাম, তারা নিজেদের মধ্যে ভুল–বোঝাবুঝি দূর করে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। ঘটনার পর থেকেই আমরা দুই শিল্পীর সঙ্গে একাধিকবার বসেছি। তাদের বক্তব্য শুনেছি, বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেছি। উদ্ভূত ঘটনার পরিস্থিতিতে তাদের দুজনকেই সালিসের জন্য ডাকা হয়। সেখানে দুটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একটি হচ্ছে তারা ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দেবেন এবং একটি ভিডিও বার্তা পাঠাবেন। সেটা আমরা প্রকাশ করব কি না, এটা একান্তই সংগঠনের নিজস্ব ব্যাপার ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দুটি সিদ্ধান্তের কোনোটাই তারা মানেননি এবং তাদেরকে পরপর দুটি চিঠি দেওয়ার পরও তারা চিঠির কোনো সদুত্তর দেননি এবং চিঠিগুলো ফেরত আসে। পরবর্তীতে তাদের ফোনও করা হয়, কিন্তু ফোনের কোনো সদুত্তর না পাওয়ায় দীর্ঘ বিরতির পর সালিস কমিটি বাধ্য হয়ে ইসি কমিটিকে তাদের সদস্যপদ বাতিলের জন্য সুপারিশ করে। পরে ইসি কমিটি সভায় এটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।’
রাশেদ মামুন অপু আরও জানান, বিরোধ মেটাতে সংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে দুই অভিনেত্রীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
চলতি বছরের ৩ মার্চ মানিকগঞ্জে পরিচালক রাফাত মজুমদারের একটি নাটকের শুটিং চলাকালে তানজিন তিশা ও সামিয়া অথৈর মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে তিশার বিরুদ্ধে মারধর ও অপদস্থ করার অভিযোগ করেন সামিয়া।
অথৈর দাবি ছিল, নাটকের একটি দৃশ্যে তাকে তিশাকে হালকাভাবে চড় মারতে নির্দেশ দিয়েছিলেন পরিচালক। সেই নির্দেশনা অনুসরণ করার পর তিশা তাকে কয়েকবার জোরে চড় মারেন। এতে তার চোখ ও গাল ফুলে যায় এবং কথা বলতেও অসুবিধা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিশার সঙ্গে আগে থেকেই ব্যক্তিগত বিরোধ থাকার কথাও জানিয়েছিলেন সামিয়া।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন তানজিন তিশা। তার বক্তব্য ছিল, শুটিংয়ের ঘটনাটি চিত্রনাট্য ও চরিত্রের প্রয়োজনে ঘটেছে, ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ থেকে তিনি সামিয়াকে আঘাত করেননি।
তিশা জানান, নাটকে তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এক কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করছেন। চরিত্রটির আচরণের অংশ হিসেবে অন্যকে আঘাত করা বা কামড় দেওয়ার মতো দৃশ্য রয়েছে। চিত্রনাট্যের নির্দেশনা মেনেই তিনি অভিনয় করেছেন বলে জানান অভিনেত্রী। নাটকটি মুক্তি পেলে দর্শক বিষয়টি বুঝতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না দেখে পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানান তিশা।
পরিচালক রাফাত মজুমদারও ঘটনাটিকে ভুল–বোঝাবুঝি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দৃশ্যটিতে দুই অভিনেত্রীরই পরস্পরকে চড় মারার কথা ছিল। অভিনয়ের সময় কোনো চড় জোরে লেগে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে থাকতে পারে।
দুই অভিনেত্রীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিনই এ বিষয়ে বিবৃতি দেয় অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশ। সংগঠনটি জানায়, কোনো সদস্যের সঙ্গে পেশাগত জটিলতা বা মতবিরোধ দেখা দিলে তা সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে অবহিত না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা আচরণবিধির পরিপন্থী।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো ঘটনার একতরফা বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অভিনয়শিল্পীদের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের বিরোধ সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতাও দিয়েছিল সংগঠনটি।
এরপর তিশা ও অথৈর বিরোধ মেটাতে সালিসসহ একাধিকবার আলোচনার আয়োজন করা হয়। তবে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য অনুযায়ী, সালিস বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেননি দুই অভিনেত্রী। কারণ দর্শানোর নোটিশেরও জবাব দেননি তারা।
উল্লেখ্য, সদস্যপদ স্থগিতের চিঠিতে শুটিং সেটে মারধরের অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি। সংগঠনের দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দুই অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি ছিল সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করা, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়া এবং সালিস কমিটির সুপারিশ।














মন্তব্যসমূহ