যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সর্বাত্মক সংঘাতের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রাখলেও কৌশলগত কারণে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাককে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব নিশ্চিত করেছে, এই চার দেশের বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম ইরানি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে (ISNA) জানান, ঘোষিত চার দেশের জাহাজ প্রণালি দিয়ে অবাধে যাতায়াত করছে এবং মার্কিন বাহিনীও এগুলোতে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে না। বিনিময়ে তেহরান প্রয়োজনীয় ওষুধ, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন এবং সম্ভাব্য বিপুল পরিমাণ ট্রানজিট রাজস্ব অর্জন করছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর কার্যত হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক রুট বন্ধ করে দেয় তেহরান। পরবর্তীতে জুলাই মাসে ওয়াশিংটন ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর সমন্বিত নৌ অবরোধ আরোপ করে। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে চার দেশকে দেওয়া ইরানের এই কৌশলগত ছাড় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হায়াত মুকাদ্দামের দাবি অনুযায়ী, এই ছাড়ের মাধ্যমে ইরান নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা নিজস্ব চিকিৎসা খাতের জন্য ভারত থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানি করছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বেইজিংয়ের কাছ থেকে জোরালো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে। পাশাপাশি কাতারও যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারত ও চীনা জাহাজ থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট মাশুল আদায় করা হলেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বন্ধুপ্রতিম কাতারের জাহাজকে সম্পূর্ণ বিনা মাশুলে হরমুজ পারাপারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে ইরাকের ক্ষেত্রে শুল্কের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের (Kpler) তথ্য অনুযায়ী, চারটি দেশই হরমুজ প্রণালির জ্বালানি প্রবাহের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। গত অক্টোবর মাসে হরমুজ দিয়ে দৈনিক পার হওয়া ১ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশের গন্তব্য ছিল ভারত। একই সময়ে আগস্টে পুরোপুরি বন্ধ থাকার পর অক্টোবরে কাতার হরমুজ হয়ে ১৮ লাখ টন এলএনজি পাঠাতে সক্ষম হয়েছে এবং ইরাকের তেল পরিবহন দৈনিক ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে ঠেকেছে।
তবে মার্কিন সামরিক কমান্ড সেন্টকম (CENTCOM) সাফ জানিয়েছে, ইরানের নিজস্ব উপকূল বা বন্দর থেকে যাওয়া-আসা করা যেকোনো দেশের জাহাজের ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধ প্রযোজ্য হবে; কেবল তৃতীয় কোনো দেশের হয়ে চলাচলকারী জাহাজ এবং মানবিক খাদ্য ও ওষুধ বহনকারী জাহাজ বিশেষ তল্লাশির পর ছাড় পেতে পারে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ছাড়ের সুযোগ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রাখা ভারত ও কাতারের জন্য এটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা














মন্তব্যসমূহ