হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের বাণিজ্যিক জাহাজকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে ইরান। দেশটির দাবি, এই চার দেশের জাহাজ এখন নির্বিঘ্নে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি ব্যবহার করতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধাক্কার পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির সহ-সভাপতি আমির হায়াত মোকাদ্দাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ভারতীয় জাহাজ চলাচলের সুযোগ থাকলে দেশটি থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানি সহজ হবে। আর চীনের জাহাজকে ছাড় দেওয়ার পেছনে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার বিষয়টি কাজ করছে।
চার দেশের জন্য দেওয়া সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা বর্তমানে চার দেশ—ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত রেখেছি। এসব দেশের জাহাজ এখন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলাচল করছে এবং আমেরিকানরাও সেগুলোতে কোনো বাধা সৃষ্টি করছে না।’’
তবে এই ছাড়ের অর্থ বিনা খরচে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের সুযোগ নয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে নির্ধারিত ট্রানজিট ফি দিতে হতে পারে। অর্থাৎ, ইরানের সিদ্ধান্তে চলাচলের অনুমতি মিললেও যাতায়াত মাশুল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।
চীনের ক্ষেত্রে ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতাদের একটি এবং তেহরানের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে চীনা জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক রাখার মাধ্যমে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে চাইছে ইরান।
অন্যদিকে, কাতার বিশ্বের অন্যতম প্রধান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশ। উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথ সচল রাখার ক্ষেত্রেও দেশটির ভূমিকা রয়েছে। ইরানের কাছে ইরাকের গুরুত্ব আবার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তেহরান ইরাকের নিরাপত্তাকে নিজেদের সুরক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে।
বর্তমানে এই জলপথে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হলেও অন্য জাহাজগুলোকে কড়া তল্লাশির মুখে পড়তে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুনতে হচ্ছে বড় অঙ্কের ট্রানজিট ফি।
সংঘাত শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে বিভিন্ন জাহাজে হামলার ঘটনায় অন্তত ১৫ জন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত সোমবার সন্ধ্যায় ওমানের লিমার কাছে এমএসভি আল জুসুফি নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় প্রাণ হারান এক ভারতীয় নাবিক।
এ পরিস্থিতিতে ভারত বারবার আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সূত্র: এনডিটিভি।














মন্তব্যসমূহ