বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক তেল পরিবহন করিডোর হরমুজ প্রণালির মুখে অবস্থিত ইরানের কৌশলগত কেশম দ্বীপে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এই অভিযানকে তাৎক্ষণিক ‘আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ পথের এত কাছে সামরিক আঘাত হানা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি উসকে দিয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের দিন এই হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে একজন শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানান, মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও বিমান লক্ষ্য করে সারফেস-টু-এয়ার (ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য) ক্ষেপণাস্ত্র তাক করা ইরানি বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করে এই প্রি-এম্পটিভ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও দ্বীপটিতে তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ অঞ্চলে টহলরত একটি মার্কিন সামরিক নজরদারি বিমানকে ইরানি বাহিনী নিশানা করার প্রস্তুতি নিলে পেন্টাগনের নির্দেশে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী প্ল্যাটফর্মে সরাসরি আঘাত হানা হয়। এই হামলায় কী পরিমাণ অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পারস্য উপসাগরে ইরানের সর্ববৃহৎ দ্বীপ কেশম মূলত হরমুজ প্রণালির মুখে অবস্থিত হওয়ায় সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ও বিমা খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আমদানিকারক ও জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম সতর্কতা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরে কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের এটিই প্রথম হামলা নয়; এর আগেও একাধিকবার দ্বীপটির সামরিক ও রাডার স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী:
৩১ মে ২০২৬: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ড্রোন ভূপাতিত করার প্রতিক্রিয়ায় কেশম ও গোরুক এলাকার ইরানি রাডার এবং ড্রোন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে আঘাত হানা হয়।
৫ জুন ২০২৬: সামুদ্রিক বাণিজ্যে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত চারটি ড্রোন ভূপাতিতের পর কেশমের রাডার সাইটে দ্বিতীয় দফা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
১৬ জুলাই ২০২৬: দ্বীপটিতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর প্রকাশ করে ইরানি গণমাধ্যম।
১ আগস্ট ২০২৬: দ্বীপটিতে বড় ধরনের বিমান হামলায় একটি বসতবাড়ি ধ্বংস হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলায় ২ হাজার পাউন্ড ওজনের শক্তিশালী ‘মার্ক-৮৪’ (Mk-84) বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে এক দম্পতি ও তাঁদের দুই বছর বয়সী সন্তান নিহত হওয়ার দাবি করে তেহরান।
১ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দেশজুড়ে হামলার অংশ হিসেবে কেশম দ্বীপেও সিরিজ বিস্ফোরণ ঘটে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, বড় যুদ্ধ শুরুর রাজনৈতিক দায় এড়াতে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াশিংটন এসব হামলার মাত্রা অত্যন্ত সীমিত রাখছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে সর্বাত্মক ও নতুন সামরিক অভিযানের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ালেও ওয়াশিংটন এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো আগ্রাসনের ঘোষণা দেয়নি। বর্তমানে তেহরানের সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তার দিকেই গভীর দৃষ্টি রাখছে গোটা বিশ্ব।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ