ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

নেতানিয়াহুকে হটাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলে ফিরছেন হাজারো ভোটার

নেতানিয়াহুকে হটাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলে ফিরছেন হাজারো ভোটার
ছবি : সংগৃহিত
ফলো করুন

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের পরিবর্তন চেয়ে হাজার হাজার ডলার খরচ করে দেশে ফিরছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অনেক ইসরায়েলি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটির সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া থেকে ইসরায়েলে গেছেন বেশ কয়েকজন প্রবাসী নাগরিক। তাঁদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে বিদেশে বসবাস করলেও এবারই প্রথম শুধু ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে ফিরেছেন।

দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে থাকা ৬৭ হাজারের বেশি ইসরায়েলি এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন বলে একটি সংগঠনের হিসাবে উঠে এসেছে। তবে এটি দেশে ফেরা মানুষের নিশ্চিত সংখ্যা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আমেরিকা ইসরায়েল ডেমোক্রেসি কোয়ালিশনের উদ্যোগ ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ এই হিসাব দিয়েছে। গত আগস্টে পরিচালিত স্বেচ্ছামূলক জরিপ এবং সংগঠনটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংখ্যাটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের মতে, এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ভোট দিলে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের প্রায় দুটি আসনের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড সিটির বাসিন্দা আয়েলেত ফ্রাঙ্ক ১৯৮৪ সালে ইসরায়েল ছেড়েছিলেন। এরপর চার দশকের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটালেও কখনো শুধু ভোট দেওয়ার জন্য দেশে ফেরেননি।

কিন্তু এবারের নির্বাচনকে ভিন্নভাবে দেখছেন তিনি। সে কারণেই রোববার (২৫ অক্টোবর) সান ফ্রান্সিসকো থেকে তেল আবিবগামী সরাসরি ফ্লাইটে ওঠেন ফ্রাঙ্ক।

ইসরায়েলের জেজরিল উপত্যকার কিবুৎজ আইন হারোদের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। এবার মাত্র দুই দিনের জন্য ইসরায়েলে গিয়ে ভোট দিয়ে আবার ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছেন।

ফ্রাঙ্কের মতে, এবারের নির্বাচন ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর ভাষায়, এই ভোটের মাধ্যমে দেশ ধ্বংসের দিকে যাবে, নাকি ইতিবাচকভাবে পুনর্গঠিত হবে, তা নির্ধারিত হতে পারে।

ফ্রাঙ্ক ছিলেন ইসরায়েলি বিমান সংস্থা এল আলের ফ্লাইট ৪৮-এর ২৭১ জন যাত্রীর একজন। ভোট শুরুর ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে বিমানটি ইসরায়েলে পৌঁছায়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সান ফ্রান্সিসকো থেকে ইসরায়েলে এটিই প্রথম সরাসরি ফ্লাইট।

‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ মনে করছেন প্রবাসীরা

ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাপিটোলার বাসিন্দা উডি পারদো ১৯৮৩ সালে ইসরায়েল ছেড়েছিলেন। পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য এখনো ইসরায়েলে থাকায় বছরে দুবার দেশে যান তিনি। কিন্তু নির্বাচনে ভোট দিতে ফেরার ঘটনা তাঁর জীবনে এবারই প্রথম।

পারদোর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে বিদেশে বসবাস করার কারণে ইসরায়েলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি তিনি। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন।

তাঁর আশঙ্কা, ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি নাকি নাফতালি বেনেটের বিয়াচাদ পার্টিকে সমর্থন করবেন। দুটি দলই নেতানিয়াহু সরকারের বিরোধী মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি।

পারদো মনে করেন, ইসরায়েলের রাজনীতিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

ইসরায়েলের নির্বাচনী আইনে বিদেশে অবস্থান করে সাধারণ নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। কেবল বিদেশে দায়িত্ব পালনরত কূটনীতিক এবং নির্দিষ্ট সরকারি কর্মচারীরা ব্যতিক্রমী সুবিধা পান।

ফলে প্রবাসী ইসরায়েলিদের ভোট দিতে সশরীরে দেশে যেতে হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ নেতৃত্বাধীন সরকার ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল। তবে অক্টোবরে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট সেই উদ্যোগ আটকে দেয়।

নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ বা ধীর করার সম্ভাবনাও সরকার বিবেচনা করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশে ফেরা প্রবাসীদের বড় একটি অংশ বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা রয়েছে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্রদের মধ্যে।

তবে প্রবাসীদের সবাই যে সরকার পরিবর্তনের পক্ষেই ভোট দেবেন, তা নিশ্চিত নয়।

সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইসরায়েলগামী যাত্রীদের মধ্যে সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা দেখা যায়।

সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক ইসরায়েলি প্রবাসী সংগঠন আনএক্সেপটেবল-এর প্রায় এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য একই ফ্লাইটে ছিলেন।

সংগঠনটি নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর সরকারের অন্যতম সমালোচক গোষ্ঠী।

সংগঠনটির সদস্যরা হালকা নীল রঙের টি-শার্ট পরেছিলেন। সেখানে নির্বাচনের তারিখের পাশাপাশি হিব্রু ভাষায় ‘পরিবর্তনের জন্য যাত্রা’ লেখা ছিল।

অন্য যাত্রীদের মধ্যেও এসব টি-শার্ট বিতরণ করা হয়। বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারের কাছে সংগঠনটি সংবাদ সম্মেলনও করে।

ক্যালিফোর্নিয়ার সানিভেলের বাসিন্দা রনি বার-নিভ ২৬ বছর আগে ইসরায়েলের তেল আবিবের উপকণ্ঠ গিভাতায়িম ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

বর্তমানে সিলিকন ভ্যালির কাছে একটি হিব্রু ভাষার বিদ্যালয় পরিচালনা করেন তিনি। বছরে চার-পাঁচবার ইসরায়েলে গেলেও এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন।

বার-নিভের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।

ইসরায়েলে সম্পত্তি থাকা, কর দেওয়া, যুদ্ধের জন্য অর্থ পাঠানো এবং সন্তানদের সেখানে বসবাসের বিষয়গুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের পরও ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন তিনি।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বার্কলির বাসিন্দা রিভকা আমাদো। জেরুজালেম ছেড়ে ২২ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এই অবসরপ্রাপ্ত নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক ও লাদিনো সংগীতশিল্পীর মতে, দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই থাকুন না কেন, গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে প্রত্যেক ইসরায়েলির ভোট দেওয়া উচিত।

গাজা যুদ্ধ এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়া নাগরিকের সংখ্যাও বেড়েছে।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৫৫ হাজার ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছিলেন। পরের বছর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮২ হাজার ৮০০ জনে।

২০২৫ সালেও ৬৯ হাজারের বেশি ইসরায়েলি বিদেশে পাড়ি দেন। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দেশে আসা মানুষের চেয়ে বেশি ছিল।

নেসেটের ডায়াসপোরা অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটসের আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ এই পরিস্থিতিকে ব্যাপক দেশত্যাগের আশঙ্কা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তাঁর মতে, এমন প্রবণতা ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য কৌশলগত হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে মোট ৩৭টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে নেসেটে প্রতিনিধিত্ব পেতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা প্রায় এক ডজন দল অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনের আগের জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে।

কোনো দলই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। ফলে নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রবাসীদের ভোট এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সানিভেলের আরেক বাসিন্দা শ্লোমি আশঙ্কা করছেন, ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন না হলে দক্ষ ও মেধাবী মানুষের দেশত্যাগ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে পালো আলটোর প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইদ্দো তাল মনে করেন, প্রবাসীদের ভোটে অংশগ্রহণ দেশের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে।

ইউসি ল সান ফ্রান্সিসকোর আইনশিক্ষক হাদার আভিরামও এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে দেশে ফিরছেন। তাঁর মতে, ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী যুদ্ধের জন্য রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রবাসী ভোটারদের এসব বক্তব্যে নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের চিত্র উঠে এলেও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।

ট্যাগ : বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েল নির্বাচন

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


নেতানিয়াহুকে হটাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলে ফিরছেন হাজারো ভোটার

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের পরিবর্তন চেয়ে হাজার হাজার ডলার খরচ করে দেশে ফিরছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অনেক ইসরায়েলি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটির সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া থেকে ইসরায়েলে গেছেন বেশ কয়েকজন প্রবাসী নাগরিক। তাঁদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে বিদেশে বসবাস করলেও এবারই প্রথম শুধু ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে ফিরেছেন।

দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে থাকা ৬৭ হাজারের বেশি ইসরায়েলি এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন বলে একটি সংগঠনের হিসাবে উঠে এসেছে। তবে এটি দেশে ফেরা মানুষের নিশ্চিত সংখ্যা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আমেরিকা ইসরায়েল ডেমোক্রেসি কোয়ালিশনের উদ্যোগ ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ এই হিসাব দিয়েছে। গত আগস্টে পরিচালিত স্বেচ্ছামূলক জরিপ এবং সংগঠনটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংখ্যাটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের মতে, এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ভোট দিলে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের প্রায় দুটি আসনের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড সিটির বাসিন্দা আয়েলেত ফ্রাঙ্ক ১৯৮৪ সালে ইসরায়েল ছেড়েছিলেন। এরপর চার দশকের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটালেও কখনো শুধু ভোট দেওয়ার জন্য দেশে ফেরেননি।

কিন্তু এবারের নির্বাচনকে ভিন্নভাবে দেখছেন তিনি। সে কারণেই রোববার (২৫ অক্টোবর) সান ফ্রান্সিসকো থেকে তেল আবিবগামী সরাসরি ফ্লাইটে ওঠেন ফ্রাঙ্ক।

ইসরায়েলের জেজরিল উপত্যকার কিবুৎজ আইন হারোদের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। এবার মাত্র দুই দিনের জন্য ইসরায়েলে গিয়ে ভোট দিয়ে আবার ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছেন।

ফ্রাঙ্কের মতে, এবারের নির্বাচন ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর ভাষায়, এই ভোটের মাধ্যমে দেশ ধ্বংসের দিকে যাবে, নাকি ইতিবাচকভাবে পুনর্গঠিত হবে, তা নির্ধারিত হতে পারে।

ফ্রাঙ্ক ছিলেন ইসরায়েলি বিমান সংস্থা এল আলের ফ্লাইট ৪৮-এর ২৭১ জন যাত্রীর একজন। ভোট শুরুর ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে বিমানটি ইসরায়েলে পৌঁছায়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সান ফ্রান্সিসকো থেকে ইসরায়েলে এটিই প্রথম সরাসরি ফ্লাইট।

‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ মনে করছেন প্রবাসীরা

ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাপিটোলার বাসিন্দা উডি পারদো ১৯৮৩ সালে ইসরায়েল ছেড়েছিলেন। পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য এখনো ইসরায়েলে থাকায় বছরে দুবার দেশে যান তিনি। কিন্তু নির্বাচনে ভোট দিতে ফেরার ঘটনা তাঁর জীবনে এবারই প্রথম।

পারদোর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে বিদেশে বসবাস করার কারণে ইসরায়েলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি তিনি। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন।

তাঁর আশঙ্কা, ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি নাকি নাফতালি বেনেটের বিয়াচাদ পার্টিকে সমর্থন করবেন। দুটি দলই নেতানিয়াহু সরকারের বিরোধী মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি।

পারদো মনে করেন, ইসরায়েলের রাজনীতিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

ইসরায়েলের নির্বাচনী আইনে বিদেশে অবস্থান করে সাধারণ নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। কেবল বিদেশে দায়িত্ব পালনরত কূটনীতিক এবং নির্দিষ্ট সরকারি কর্মচারীরা ব্যতিক্রমী সুবিধা পান।

ফলে প্রবাসী ইসরায়েলিদের ভোট দিতে সশরীরে দেশে যেতে হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ নেতৃত্বাধীন সরকার ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল। তবে অক্টোবরে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট সেই উদ্যোগ আটকে দেয়।

নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ বা ধীর করার সম্ভাবনাও সরকার বিবেচনা করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশে ফেরা প্রবাসীদের বড় একটি অংশ বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা রয়েছে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্রদের মধ্যে।

তবে প্রবাসীদের সবাই যে সরকার পরিবর্তনের পক্ষেই ভোট দেবেন, তা নিশ্চিত নয়।

সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইসরায়েলগামী যাত্রীদের মধ্যে সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা দেখা যায়।

সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক ইসরায়েলি প্রবাসী সংগঠন আনএক্সেপটেবল-এর প্রায় এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য একই ফ্লাইটে ছিলেন।

সংগঠনটি নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর সরকারের অন্যতম সমালোচক গোষ্ঠী।

সংগঠনটির সদস্যরা হালকা নীল রঙের টি-শার্ট পরেছিলেন। সেখানে নির্বাচনের তারিখের পাশাপাশি হিব্রু ভাষায় ‘পরিবর্তনের জন্য যাত্রা’ লেখা ছিল।

অন্য যাত্রীদের মধ্যেও এসব টি-শার্ট বিতরণ করা হয়। বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারের কাছে সংগঠনটি সংবাদ সম্মেলনও করে।

ক্যালিফোর্নিয়ার সানিভেলের বাসিন্দা রনি বার-নিভ ২৬ বছর আগে ইসরায়েলের তেল আবিবের উপকণ্ঠ গিভাতায়িম ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

বর্তমানে সিলিকন ভ্যালির কাছে একটি হিব্রু ভাষার বিদ্যালয় পরিচালনা করেন তিনি। বছরে চার-পাঁচবার ইসরায়েলে গেলেও এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন।

বার-নিভের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।

ইসরায়েলে সম্পত্তি থাকা, কর দেওয়া, যুদ্ধের জন্য অর্থ পাঠানো এবং সন্তানদের সেখানে বসবাসের বিষয়গুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের পরও ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন তিনি।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বার্কলির বাসিন্দা রিভকা আমাদো। জেরুজালেম ছেড়ে ২২ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এই অবসরপ্রাপ্ত নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক ও লাদিনো সংগীতশিল্পীর মতে, দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই থাকুন না কেন, গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে প্রত্যেক ইসরায়েলির ভোট দেওয়া উচিত।

গাজা যুদ্ধ এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়া নাগরিকের সংখ্যাও বেড়েছে।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৫৫ হাজার ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছিলেন। পরের বছর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮২ হাজার ৮০০ জনে।

২০২৫ সালেও ৬৯ হাজারের বেশি ইসরায়েলি বিদেশে পাড়ি দেন। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দেশে আসা মানুষের চেয়ে বেশি ছিল।

নেসেটের ডায়াসপোরা অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটসের আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ এই পরিস্থিতিকে ব্যাপক দেশত্যাগের আশঙ্কা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তাঁর মতে, এমন প্রবণতা ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য কৌশলগত হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে মোট ৩৭টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে নেসেটে প্রতিনিধিত্ব পেতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা প্রায় এক ডজন দল অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনের আগের জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে।

কোনো দলই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। ফলে নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রবাসীদের ভোট এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সানিভেলের আরেক বাসিন্দা শ্লোমি আশঙ্কা করছেন, ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন না হলে দক্ষ ও মেধাবী মানুষের দেশত্যাগ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে পালো আলটোর প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইদ্দো তাল মনে করেন, প্রবাসীদের ভোটে অংশগ্রহণ দেশের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে।

ইউসি ল সান ফ্রান্সিসকোর আইনশিক্ষক হাদার আভিরামও এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে দেশে ফিরছেন। তাঁর মতে, ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী যুদ্ধের জন্য রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রবাসী ভোটারদের এসব বক্তব্যে নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের চিত্র উঠে এলেও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ