মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। তেহরানে চার দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত আসে। একই সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার তেহরানে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর চার দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। এতে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার এবং সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মতি জানানো হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরকারী সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ সৌদি আরব ও ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ার পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আল সৌদ। তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ছোট ভাই। পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের পক্ষে গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন।
ইরানের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজায়ি বৈঠকে অংশ নেন।
সৌদি আরব জানিয়েছে, তেহরান সফরের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক উত্তেজনা পুনরায় ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আলোচনার পথ তৈরি করা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল আঞ্চলিক পর্যায়ে একে অপরের বিরুদ্ধে আগ্রাসন না চালানোর একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা, সৌদি আরবে হুতিদের হামলা, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
পাকিস্তানের আরেক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্মতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়া আসিম মুনির তেহরানের কাছে একটি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। এতে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষের জন্য সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে প্রস্তাবটির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির তিন দেশ এবং কাতার নিশ্চয়তা প্রদানকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে বলেও ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এদিকে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মহসেন রেজায়ি বৈঠককে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না।
সৌদি আরবে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, দেশটির পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে হুতিদের ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল অভিমুখে আসা চারটি ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় রিয়াদ ও দক্ষিণ সৌদি আরবের আকাশে আরও তিনটি ড্রোন ধ্বংস করার কথা জানায় জোটটি।
এসব সর্বশেষ হামলার বিষয়ে হুতিদের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সোমবারের আগের দিকে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাম্পিং স্টেশনে হামলার দাবি করেছিল হুতিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।
জবাবে পাল্টা হামলা চালিয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের পাঁচটি সুড়ঙ্গ, চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
চলতি মাসে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। সৌদি আরবে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় নতুন উদ্বেগ
তেহরানের এই বৈঠক এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।
এর আগে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় জুন মাসে একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার সংঘাত শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘর্ষ নতুন মাত্রা পায়। এতে ইয়েমেনের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
গত মাসে হুতিরা সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। এরপর পাল্টা অভিযান শুরু হয় এবং হুতিদের ওপর সৌদি হামলা জোরদার করা হয়।
আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদার মিসরও দেশটির প্রতিরক্ষায় সহযোগিতার দিকে এগিয়েছে। সোমবার মিসরের পার্লামেন্ট সৌদি আরবকে রক্ষায় সামরিক বাহিনীর সহায়তার অনুমোদন দিয়েছে।
চার দেশের আলোচনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন মাত্রা যোগ করলেও সংঘাত নিরসনে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
সূত্র: আল জাজিরা।
মন্তব্যসমূহ