মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারের মুখে নতুন সংকটে ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয় ও পরাজয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। এই নির্বাচন কেবল ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর কীভাবে পরিচালিত হবে তার চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণী নিয়ামক। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাম্পের সামনে অপেক্ষা করছে কংগ্রেসীয় তদন্ত, তীব্র রাজনৈতিক চাপ, নথিপত্র তলবে সমন এবং এমনকি তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) নতুন সাংবিধানিক ঝুঁকি।মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একের পর এক আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এসব তদন্তের আওতায় আসবে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত, ট্রাম্প পরিবারের দীর্ঘদিনের পারিবারিক ব্যবসা, জেফরি এপস্টেইনের নথিপত্র সংক্রান্ত বিষয়, করপোরেট দুর্নীতি এবং প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেসরকারি স্বার্থান্বেষী মহলের গোপন আঁতাত। এমনকি ডেমোক্র্যাটদের একাংশ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পুনরায় অভিশংসন প্রস্তাব আনার পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে।নির্বাচনের এই সম্ভাব্য পরাজয়ের নেতিবাচক প্রভাব কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও প্রভাব অনেকটাই সংকুচিত করে তুলবে। কারণ, ট্রাম্প নিজেই পুরো নির্বাচন প্রচারণাকে নিজের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার অগ্নিপরীক্ষায় রূপ দিয়েছিলেন এবং সমর্থকদের বারবার তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন যেন তাঁরা ভাবেন খোদ ট্রাম্পই ব্যালটে প্রার্থী হিসেবে আছেন। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল নিজের ক্যারিশমা সামনে রেখে সেইসব কট্টর রক্ষণশীল ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা, যারা অন্য কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীর জন্য ভোটকেন্দ্রে আসতেন না। তবে ডেমোক্র্যাটরা এই কৌশলকে উল্টো অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। তাদের মতে, ট্রাম্প নিজেকে সামনে রাখায় ভোটারদের কাছে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের জন্য সরাসরি কে দায়ী, সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যান্ডি কিম মন্তব্য করেছেন যে, ট্রাম্প সবাইকে তাঁর কথা ভাবতে বাধ্য করেছেন এবং জনগণ এখন তিনি সরাসরি মানুষের কী পরিমাণ ক্ষতি করেছেন তা নিয়ে বিচার করছে।কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও পুরোপুরি অবগত। কারণ, তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ দুই বছরও ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি পরিষদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘাত ও তদন্তের মধ্য দিয়েই পার হয়েছিল। তবে ট্রাম্প কখনোই বিরোধীদের চাপকে হালকাভাবে নেওয়া বন্ধ করেননি। তিনি রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতে নিজেই সতর্ক করে বলেছেন যে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই তাঁকে পুনরায় অভিশংসিত করার উদ্যোগ নেবে। যদিও বিরোধীদের আক্রমণকে ট্রাম্প সবসময় নিজের রাজনৈতিক সমর্থন জোরালো করা এবং অনুদান সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবেও সফলভাবে ব্যবহার করে থাকেন।ইতিমধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ডেমোক্র্যাটরা তাদের তদন্তের অগ্রাধিকার তালিকা চূড়ান্ত করতে শুরু করেছে। প্রতিনিধি পরিষদের নজরদারি কমিটির সম্ভাব্য প্রধান ক্যালিফোর্নিয়ার আইনপ্রণেতা রবার্ট গার্সিয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি অভিবাসন নীতি ও বন্দিশালাগুলোর ওপর কঠোর তদারকি করবেন। কোনো ধরনের আগাম বার্তা ছাড়াই তিনি সম্প্রতি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি অভিবাসন আটক কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন এবং সংবাদ সম্মেলন করে আইসিই-এর যেকোনো অসংগতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকলে ডেমোক্র্যাটরা স্থায়ী কমিটি, বাজেট বরাদ্দ, নিজস্ব তদন্তকারী দল এবং বাধ্যতামূলক সমন (Subpoena) জারির পূর্ণ কর্তৃত্ব পাবে, যার মাধ্যমে প্রশাসনের কাছ থেকে যে কোনো স্পর্শকাতর নথি ও ব্যক্তিগত সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে।পাল্টা হিসেবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে হোয়াইট হাউস। প্রথম মেয়াদের মতোই তারা নথি প্রদান বিলম্বিত করা এবং ‘এক্সিকিউটিভ প্রিভিলেজ’ বা নির্বাহী বিভাগের বিশেষ আইনি অধিকার দাবি করে তদন্তকে শ্লথ করার কৌশল গ্রহণ করতে পারে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প তাঁর রাষ্ট্রপতির ভেটো ক্ষমতার ওপর নির্ভর করার কথা জানিয়েছেন। ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন যে এমন অচলাবস্থা তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধীদের সঙ্গে আপস আলোচনায় বসতে হবে। তবে প্রতিনিধি পরিষদে হাকিম জেফ্রিস যদি স্পিকার নির্বাচিত হন, তবে তিনি ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের মুখোমুখি করতে পারেন, যদিও প্রথম মেয়াদে দুইবার অভিশংসিত হয়েও সিনেটে খালাস পেয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যদেরও ডেমোক্র্যাটরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিতর্কিত সামরিক ভূমিকা ও ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তদন্তের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে জেফ্রিস হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁদের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে পিট হেগসেথকে ওয়াশিংটন ছাড়া করা।