যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বহু দশকের অপরাজেয় দুর্গ টেক্সাসে অবিস্মরণীয় এক রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। অর্ধ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেকর্ড অর্থব্যয় ও ধনকুবেরদের প্রভাবকে গুঁড়িয়ে দিয়ে মার্কিন সিনেট এবং গভর্নর পদ—উভয় শীর্ষ আসনেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে দলটি।
রাজ্যের রাজধানী অস্টিনে দেওয়া বিজয় ভাষণে নবনির্বাচিত সিনেটর জেমস তালারিকো ঘোষণা করেন, “আমরা এইমাত্র টেক্সাস পুনরুদ্ধার করলাম। আমরা প্রমাণ করলাম যে, পৃথিবীর সমস্ত অর্থও টেক্সাসের সাধারণ মানুষের ইচ্ছার কাছে কিছুই নয়।” বিভাজনের বিরুদ্ধে ভালোবাসার রাজনীতির জয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক রায় দেশের শতকোটিপতি, ট্রিলিয়নিয়ার মহাদাতা এবং ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত রক্ষকদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল জনগণের হাতেই থাকে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রতিষ্ঠিত সিনেটরদের বাদ দিয়ে কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তাঁর পক্ষে ধনকুবের ইলন মাস্ক একাই অন্তত ২১২ মিলিয়ন (২১ কোটি ২০ লাখ) ডলার ব্যয় করেছিলেন। টেক্সাসে সদর দপ্তর থাকা স্পেসএক্স-এর কর্ণধার মাস্ক দেশজুড়ে এই নির্বাচনে বিপুল অর্থ ঢেলেছিলেন, কারণ ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে তাঁর প্রস্তাবিত ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সংসদীয় তদন্ত শুরুর স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। তবে রেকর্ড ভাঙা অর্থ ঢালার পরও প্যাক্সটন দলের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ন্যূনতম উদ্দীপনা তৈরি করতে ব্যর্থ হন। হিউস্টনে অনুষ্ঠিত বিজয় উৎসবে অংশ নিয়ে টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ক্রিশ্চিয়ান মেনেফি বলেন, টেক্সাস আজ পুরো আমেরিকান জাতির কাছে একটি নতুন আশা পুনরুদ্ধার করেছে।
এদিকে সিনেটের পাশাপাশি গভর্নর পদেও তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব নতুন ইতিহাস। সব জনমত জরিপ ও শেষ মুহূর্তের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে টেক্সাসের প্রথম ল্যাটিনা গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। টেক্সাসের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ ল্যাটিনো হওয়া সত্ত্বেও এর আগে কোনো ল্যাটিনা নারী এই পদে পৌঁছাতে পারেননি।
বিজয়ী ভাষণে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হিনোজোসা। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার আঞ্চলিক যোগাযোগ পরিচালক আলেজান্দ্রা পেইমবার্ট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, এই ফল বিদায়ী গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের দীর্ঘ ১০ বছরের কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে জনগণের এক তীব্র চপেটাঘাত। অ্যাবট ট্রাম্পের গণ-নির্বাসন অভিযানকে অন্ধভাবে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে স্থানীয় পুলিশ দিয়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন এবং অভিবাসী পরিবারগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে তুলেছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, টেক্সাসের শীর্ষ আসনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো ‘পুতুল গভর্নর’ আর বসে থাকবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, টেক্সাসের উগ্র রক্ষণশীল নীতি, গর্ভপাতের অধিকার খর্ব, দারিদ্র্য ও কর্পোরেট তোষণনীতির কারণে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এবারের ব্যালটে। তরুণ প্রজন্মের ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে শীর্ষ ধনীদের প্রভাবকে পেছনে ফেলে টেক্সাস এক যুগান্তকারী নীল তরঙ্গে নতুন যুগে প্রবেশ করল।
সূত্র: আল জাজিরা

মন্তব্যসমূহ