ঢাকা    সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

২ লাখ কোটি ডলারের বাণিজ্য জাপানের, বাংলাদেশের সঙ্গে কত

২ লাখ কোটি ডলারের বাণিজ্য জাপানের, বাংলাদেশের সঙ্গে কত
ছবি : সংগৃহীত
ফলো করুন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ কোটি (২ ট্রিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বিশাল বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই বিশাল পরিধির মাঝে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশের সঙ্গেও দেশটির বাণিজ্যিক লেনদেন ক্রমাগত বাড়ছে। তবে জাপানের বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় বাংলাদেশের সঙ্গে মোট আমদানি-রপ্তানির আকার এখনো তুলনামূলক সীমিত—প্রায় ৩২৮ কোটি ডলার। বর্তমানে জাপান বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থিত হয়ে একসময় বিশ্বশিল্পের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল জাপান। অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে বৈশ্বিক বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেছিল দেশটি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও গাড়ি ও গৃহস্থালি পণ্য মানেই ছিল জাপানি ব্র্যান্ডের নির্ভরযোগ্যতা। মোটরসাইকেল মানেই হোন্ডা এবং রঙিন টেলিভিশন মানেই সনির যে সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল, তা এখনো বহু মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

তবে নব্বইয়ের দশকের আর্থিক স্থবিরতা, কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাস, জনসংখ্যায় প্রবীণদের আধিক্য এবং তথ্যপ্রযুক্তির বৈশ্বিক দৌড়ে চীনের তীব্র উত্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষ অর্থনীতি হওয়ার জাপানি স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নানা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার কোটি ডলারের জিডিপি নিয়ে জাপান এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৩২৮ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ মূলত জাপান থেকে গাড়ি, উচ্চমানের ইলেকট্রনিকস পণ্য, ভারী যন্ত্রপাতি এবং লোহা ও ইস্পাত আমদানি করে থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চার দিনের টোকিও সফর এই বাণিজ্যিক লেনদেনকে বহুগুণ সম্প্রসারিত করার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে বলে আশা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জাপানের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আকার ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার এবং পণ্য আমদানি ছিল ৭২ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার, যা পণ্য বাণিজ্যে সামান্য বাণিজ্য ঘাটতি নির্দেশ করে। অন্যদিকে সেবা খাতে দেশটির সেবা রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৬১০ কোটি ডলারে এবং সেবা আমদানি হয়েছে ২৬ হাজার ৯২০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে।

জাপানের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে মোটরগাড়ি (মোট রপ্তানির ১৪.৩%), ইলেকট্রনিক সার্কিট ও চিপস, সেমিকন্ডাক্টর তৈরির বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি এবং ভারী শিল্প সরঞ্জাম থেকে। বিপরীতে দেশটির আমদানির বড় অংশ দখল করে আছে জ্বালানি পণ্য—যার মধ্যে অপরিশোধিত খনিজ তেল (৮.৫%), এলএনজি গ্যাস ও কয়লা অন্যতম।

জাপানের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৮.৬%), যার পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন (১৭%)। এরপরের তালিকায় রয়েছে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকং। তবে আমদানির ক্ষেত্রে জাপানের সবচেয়ে বড় উৎস চীন, যেখান থেকে দেশটির মোট আমদানির ২৩.৬ শতাংশ আসে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ব্যাপক পণ্য আনে টোকিও।

চীনের পর এশিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারও জাপান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তির সক্রিয় সদস্য হিসেবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ঐক্যে দেশটি নেতৃত্ব দিচ্ছে। একদিকে উন্নত প্রযুক্তি ও স্বয়ংচালিত শিল্পে বিশ্বমানের শক্তিমত্তা, অন্যদিকে জ্বালানি ও কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা—এই দুই বাস্তবতার সমন্বয়েই পরিচালিত হচ্ছে আজকের জাপানি অর্থনীতি।

ট্যাগ : বাংলাদেশ জাপান

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


২ লাখ কোটি ডলারের বাণিজ্য জাপানের, বাংলাদেশের সঙ্গে কত

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ কোটি (২ ট্রিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বিশাল বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই বিশাল পরিধির মাঝে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশের সঙ্গেও দেশটির বাণিজ্যিক লেনদেন ক্রমাগত বাড়ছে। তবে জাপানের বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় বাংলাদেশের সঙ্গে মোট আমদানি-রপ্তানির আকার এখনো তুলনামূলক সীমিত—প্রায় ৩২৮ কোটি ডলার। বর্তমানে জাপান বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থিত হয়ে একসময় বিশ্বশিল্পের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল জাপান। অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে বৈশ্বিক বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেছিল দেশটি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও গাড়ি ও গৃহস্থালি পণ্য মানেই ছিল জাপানি ব্র্যান্ডের নির্ভরযোগ্যতা। মোটরসাইকেল মানেই হোন্ডা এবং রঙিন টেলিভিশন মানেই সনির যে সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল, তা এখনো বহু মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

তবে নব্বইয়ের দশকের আর্থিক স্থবিরতা, কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাস, জনসংখ্যায় প্রবীণদের আধিক্য এবং তথ্যপ্রযুক্তির বৈশ্বিক দৌড়ে চীনের তীব্র উত্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষ অর্থনীতি হওয়ার জাপানি স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নানা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার কোটি ডলারের জিডিপি নিয়ে জাপান এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৩২৮ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ মূলত জাপান থেকে গাড়ি, উচ্চমানের ইলেকট্রনিকস পণ্য, ভারী যন্ত্রপাতি এবং লোহা ও ইস্পাত আমদানি করে থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চার দিনের টোকিও সফর এই বাণিজ্যিক লেনদেনকে বহুগুণ সম্প্রসারিত করার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে বলে আশা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জাপানের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আকার ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার এবং পণ্য আমদানি ছিল ৭২ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার, যা পণ্য বাণিজ্যে সামান্য বাণিজ্য ঘাটতি নির্দেশ করে। অন্যদিকে সেবা খাতে দেশটির সেবা রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৬১০ কোটি ডলারে এবং সেবা আমদানি হয়েছে ২৬ হাজার ৯২০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে।

জাপানের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে মোটরগাড়ি (মোট রপ্তানির ১৪.৩%), ইলেকট্রনিক সার্কিট ও চিপস, সেমিকন্ডাক্টর তৈরির বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি এবং ভারী শিল্প সরঞ্জাম থেকে। বিপরীতে দেশটির আমদানির বড় অংশ দখল করে আছে জ্বালানি পণ্য—যার মধ্যে অপরিশোধিত খনিজ তেল (৮.৫%), এলএনজি গ্যাস ও কয়লা অন্যতম।

জাপানের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৮.৬%), যার পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন (১৭%)। এরপরের তালিকায় রয়েছে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকং। তবে আমদানির ক্ষেত্রে জাপানের সবচেয়ে বড় উৎস চীন, যেখান থেকে দেশটির মোট আমদানির ২৩.৬ শতাংশ আসে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ব্যাপক পণ্য আনে টোকিও।

চীনের পর এশিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারও জাপান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তির সক্রিয় সদস্য হিসেবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ঐক্যে দেশটি নেতৃত্ব দিচ্ছে। একদিকে উন্নত প্রযুক্তি ও স্বয়ংচালিত শিল্পে বিশ্বমানের শক্তিমত্তা, অন্যদিকে জ্বালানি ও কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা—এই দুই বাস্তবতার সমন্বয়েই পরিচালিত হচ্ছে আজকের জাপানি অর্থনীতি।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ