দেশের আদালতগুলোতে জমে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য শুধু বিচারপতি কিংবা বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁর মতে, মামলাজট নিরসনে প্রতিটি বেঞ্চের মামলা নিষ্পত্তির হার এবং বিচারিক কার্যক্রমের গতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিচারব্যবস্থা, মামলাজট, সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার এবং গাজীপুরের মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নিপীড়নের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, আদালতে নতুন বেঞ্চ গঠনের পাশাপাশি বিদ্যমান বেঞ্চগুলো কতটা কার্যকরভাবে মামলা নিষ্পত্তি করছে, সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার জন্য গঠিত একটি বেঞ্চের কার্যক্রমের উদাহরণ দেন তিনি।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ওই বেঞ্চ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিদের প্রায় ২৪টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। অথচ একই ধরনের বিচারিক এখতিয়ার থাকা অন্য বেঞ্চগুলোর মামলা নিষ্পত্তির হার সমান নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর মতে, এমন পার্থক্য থেকেই বোঝা যায়, শুধু বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে বিচারিক কার্যক্রমের দক্ষতা ও নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা বিচারপ্রার্থীদের অধিকারের বিষয়েও গুরুত্ব দেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
তিনি বলেন, বিশেষ করে নির্জন কারাবাসে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। আদালতের রায়ে কেউ অপরাধী প্রমাণিত হলে তিনি সাজা ভোগ করবেন। আর নির্দোষ প্রমাণিত হলে খালাস পাবেন।
বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে কেউ যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি অতিরিক্ত বেঞ্চ গঠন কিংবা বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় বিবেচনা করতে পারেন। তবে এর পাশাপাশি মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তির গতিও বাড়াতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়েও কথা বলেন রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি জানান, আদালতের এজলাসগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গার অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক আইনজীবীর উপস্থিতির কারণে সাংবাদিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক প্রতিনিধিকে এজলাসে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার একটি বিকল্প প্রস্তাব এসেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রস্তাবটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শনিবারও দুইজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি আদালত প্রশাসনের নজরে এনেছেন।
সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
এদিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের বিষয়েও কথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষকদের কাছে নিজেদের অনিরাপদ মনে না করে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
তবে কোনো অভিযোগ ওঠার পর আবেগের বশবর্তী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর মতে, শিক্ষার্থী নিপীড়নের মতো অভিযোগের তদন্ত ও বিচার দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
একই সঙ্গে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য পুরো শিক্ষক সমাজকে দায়ী না করার আহ্বান জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা এবং আইন অনুসরণ করে সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা হলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা কমবে বলেও মত দেন তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বিচারপ্রার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো এবং আদালতের কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
মন্তব্যসমূহ