ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোকে ইসরায়েলের ‘প্রধান লক্ষ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে দেশটির সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোতে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধনের সামর্থ্য থাকলেও সামরিক উপায়ে তেহরানের সরকার উৎখাত করা ইসরায়েলের পক্ষে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশদ বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, ইসরায়েলের এই আক্রমণাত্মক ঘোষণার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণও জড়িত থাকতে পারে। বিশেষ করে সামনে জাতীয় নির্বাচন এবং জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর সমর্থন কমতে থাকার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কড়া বার্তা সামনে এসেছে। যদিও সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর আলোচনা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ইসরায়েল সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে, তবুও ইরানের সরকার উৎখাতের মতো চরম সামরিক পদক্ষেপে ওয়াশিংটন সরাসরি অংশ নেবে কি না, তার কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা মেলেনি।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক আরবান কনিংহ্যামের মতে, ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক আধুনিক যুদ্ধবিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহের উন্নত ব্যবস্থা ইরানের আকাশসীমায় গিয়ে বোমাবর্ষণের সুবিধা তৈরি করে। তবে তুরস্কের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চাগলার কুরচ সতর্ক করে বলেন, আকাশপথে সামরিক স্থাপনা বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করা আর একটি দেশের সার্বিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সরকার পতন ঘটানো এক বিষয় নয়। ইরানের গভীরে অবস্থিত গোপন ও ভূগর্ভস্থ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেবল বিমান হামলায় ধ্বংস করা কার্যত অসম্ভব।
নেতানিয়াহু নিজেও অতীতে স্বীকার করেছিলেন যে কেবল বিমান হামলা দিয়ে সরকার পতন সম্ভব নয়, এজন্য স্থল অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু ইরানের মতো বিশাল আয়তন, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং আট কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশে সেনা নামিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করা ইসরায়েলের মতো ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে অসম্ভব এক সামরিক দুঃসাহস। তাছাড়া ইরানের অভ্যন্তরীণ কুর্দি বা বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মাধ্যমে তেহরানের নেতৃত্ব বদলানোর সুযোগও সীমিত, কারণ ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিরুদ্ধে বৃহৎ সামরিক প্রতিরোধ গড়ার মতো রসদ তাদের নেই।
পাল্টা হামলার ঝুঁকিও ইসরায়েলের জন্য এক বড় কৌশলগত মাথাব্যথা। আরইউএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশলের মতে, ইরানের হাতে বিপুল পরিমাণ জাহাজবিধ্বংসী ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে ইরানের সস্তা ড্রোন ও রকেট ঠেকাতে গিয়ে ইসরায়েলের অ্যারো, ডেভিডস স্লিং কিংবা আয়রন ডোমের মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তাছাড়া ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে নতুন হামলার প্রস্তাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাৎক্ষণিক সম্মতি দেননি। গভীর ভূগর্ভের বাঙ্কার ধ্বংস করতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘জিবিইউ-৫৭’ বাঙ্কারবিধ্বংসী বোমা ও বি-২ বোমারু বিমানের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া নাতাঞ্জ বা ফোরদোর মতো সুরক্ষিত পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের আঘাত হানার একক সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ইসরায়েল ইরানের সামরিক শক্তিতে চিড় ধরাতে পারলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন সামরিক পর্যবেক্ষকরা।
সূত্র: আল জাজিরা
মন্তব্যসমূহ