ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি আরবে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ (প্রাইভেট জেট) ভাড়ার ব্যয় একলাফে আকাশচুম্বী আকার ধারণ করেছে। হামলার মুখে রাজধানী রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়া এবং নিয়মিত বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ছাড়তে আগ্রহী শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, করপোরেট কর্মকর্তা এবং ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া নেওয়ার চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ও চার্টার ব্রোকারদের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় জোগানের তীব্র ঘাটতির কারণে ভাড়া বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যয়বহুল ‘যুদ্ধঝুঁকি বিমা’ (ওয়ার রিস্ক ইনস্যুরেন্স)।
হুতিদের প্রাণঘাতী হামলার কারণে গত ১০ অক্টোবর থেকে রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। উড়োজাহাজ চলাচল সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা ‘সিরিয়াম’-এর হিসাব মতে, হামলা শুরুর পর থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত ৫ হাজার ৫০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। জার্মানির লুফথানসা ও ইতালির আইটিএ তাদের ফ্লাইট পরিচালনা পুরোপুরি স্থগিত করেছে; ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও এয়ার ফ্রান্সের মতো সংস্থাও তাদের সূচি পিছিয়ে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া দেওয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘লাক্স জেটস’-এর কর্মকর্তা আলেকজান্ডার গ্রাহাম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে রিয়াদের উত্তরের আল-কাসিম বিমানবন্দর থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাগামী বোম্বার্ডিয়ার গ্লোবাল ‘৬০০০’ মডেলের একটি দূরপাল্লার জেটের ভাড়া ঠেকেছে ৯৪ হাজার ইউরোতে। অথচ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় একই ফ্লাইটের ভাড়া ছিল প্রায় ৬০ হাজার ইউরোর কাছাকাছি। এ ছাড়া অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্ম ‘এন্টারজেটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা চার্লস রবিনসন জানান, সৌদি আরব থেকে ইউরোপগামী ব্যক্তিগত বিমানের ভাড়া এখন দেড় লাখ ডলার পর্যন্ত উঠেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৫০ হাজার ডলারে।
সংকট উত্তরণে রিয়াদ ছাড়তে ইচ্ছুক ধনী ব্যক্তিরা বিকল্প হিসেবে রাজধানী থেকে প্রায় ২০০ মাইল দূরে অবস্থিত অপেক্ষাকৃত ছোট ‘আল-কাসিম’ বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। যাদের প্রাইভেট জেট ভাড়া করার সামর্থ্য নেই, তাদের অনেকেই সড়কপথে প্রতিবেশী বাহরাইন কিংবা কাতারে গিয়ে সেখান থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট ধরছেন। পশ্চিমা বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান রিয়াদে কর্মরত তাদের শীর্ষ নির্বাহীদের জরুরি ভিত্তিতে দুবাই বা ইউরোপে ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে।
ভাড়ার পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকি বিমার চড়া মাশুলও যাত্রীদের বাড়তি চাপের মুখে ফেলছে। বড় আকারের ১৮ আসনের বিমানের জন্য অতিরিক্ত ২০ হাজার ডলার এবং মাঝারি জেটের ক্ষেত্রে ৮ হাজার ডলার পর্যন্ত বিমা প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট খাতের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলে যে ধরনের গণউদ্বাস্তু পরিস্থিতি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো ততটা চরম আকার ধারণ করেনি। তবুও বাণিজ্যিক আকাশপথ সংকুচিত হওয়ায় ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ খাতটি এখন ব্যাপক চাপে রয়েছে।
মন্তব্যসমূহ