ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

৬৩৩ প্রাণহানির পরও কাটেনি শঙ্কা, নতুন বন্যার মুখে নেপাল

৬৩৩ প্রাণহানির পরও কাটেনি শঙ্কা, নতুন বন্যার মুখে নেপাল
ছবি: সংগৃহীত
ফলো করুন

নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ধ্বংসযজ্ঞের পর নতুন করে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষে তৈরি হওয়া একটি নতুন হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় ওই এলাকায় আবারও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও তিব্বতে এখন পর্যন্ত ৬৩৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া এখনো ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

দুর্যোগের দুই দিন পর শুক্রবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় তৈরি হওয়া নতুন হ্রদের পানি বাড়তে শুরু করায় উদ্ধার অভিযান কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ায় সেখানে একটি বড় জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

নেপালের রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় তৈরি হওয়া হ্রদের পানি উপচে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। রাসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার জানান, নদীর পানির উচ্চতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে হ্রদটিতে ঠিক কত পরিমাণ পানি জমেছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগের পর এলাকায় দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি তৈরি হয়েছে হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায়, যেখানে হিমবাহ গলে আসা পানি জমে আছে। অন্যটি তৈরি হয়েছে লহেন্দে নদীর ওপর বিশাল ভূমিধসের কারণে, যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নতুন হ্রদটি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই নদীগুলো দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে কাঠমান্ডু উপত্যকার দিকে চলে গেছে। ফলে হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্রুত বন্যা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই বলেন, বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও কাদা নদীর পথ আটকে দেওয়ার কারণে এই প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছে। এমন বাঁধ দীর্ঘ সময় স্থায়ী নাও হতে পারে। যেকোনো সময় তা ভেঙে গেলে ধ্বংসাবশেষসহ ভয়াবহ বন্যা তৈরি হতে পারে।

নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিতেশ খড়কা জানান, স্যাটেলাইট ছবি ও ড্রোন ফুটেজে দুর্যোগের পর দুটি নতুন হ্রদের অস্তিত্ব দেখা গেছে। তার মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।

চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে থাকতে পারে। আগামী কয়েক দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের হ্রদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া। পাহাড়ি এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সময় খুব কম থাকে। একই সঙ্গে কাদা ও পাথর মিশ্রিত পানির স্রোত উদ্ধারকাজ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

চীনের পক্ষ থেকে হ্রদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠানো হয়েছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার কারণে সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ ধস ও এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে উন্নত স্যাটেলাইট নজরদারি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, নদীর পানির পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।

হিমালয় অঞ্চলে এর আগেও হিমবাহ ধস ও গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের হুনজা উপত্যকায় হিমবাহের হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। চীন ও তিব্বত অঞ্চলেও এর আগে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপাল ও চীন সীমান্তের নতুন হ্রদটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পর আবারও বড় ধরনের দুর্যোগের মুখে পড়তে পারে ওই অঞ্চল।

সূত্র: আল জাজিরা

ট্যাগ : নেপাল বন্যা তিব্বত হিমবাহ ধস

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


৬৩৩ প্রাণহানির পরও কাটেনি শঙ্কা, নতুন বন্যার মুখে নেপাল

প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ধ্বংসযজ্ঞের পর নতুন করে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষে তৈরি হওয়া একটি নতুন হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় ওই এলাকায় আবারও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও তিব্বতে এখন পর্যন্ত ৬৩৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া এখনো ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

দুর্যোগের দুই দিন পর শুক্রবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় তৈরি হওয়া নতুন হ্রদের পানি বাড়তে শুরু করায় উদ্ধার অভিযান কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ায় সেখানে একটি বড় জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

নেপালের রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় তৈরি হওয়া হ্রদের পানি উপচে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। রাসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার জানান, নদীর পানির উচ্চতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে হ্রদটিতে ঠিক কত পরিমাণ পানি জমেছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগের পর এলাকায় দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি তৈরি হয়েছে হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায়, যেখানে হিমবাহ গলে আসা পানি জমে আছে। অন্যটি তৈরি হয়েছে লহেন্দে নদীর ওপর বিশাল ভূমিধসের কারণে, যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নতুন হ্রদটি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই নদীগুলো দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে কাঠমান্ডু উপত্যকার দিকে চলে গেছে। ফলে হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্রুত বন্যা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই বলেন, বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও কাদা নদীর পথ আটকে দেওয়ার কারণে এই প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছে। এমন বাঁধ দীর্ঘ সময় স্থায়ী নাও হতে পারে। যেকোনো সময় তা ভেঙে গেলে ধ্বংসাবশেষসহ ভয়াবহ বন্যা তৈরি হতে পারে।

নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিতেশ খড়কা জানান, স্যাটেলাইট ছবি ও ড্রোন ফুটেজে দুর্যোগের পর দুটি নতুন হ্রদের অস্তিত্ব দেখা গেছে। তার মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।

চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে থাকতে পারে। আগামী কয়েক দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের হ্রদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া। পাহাড়ি এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সময় খুব কম থাকে। একই সঙ্গে কাদা ও পাথর মিশ্রিত পানির স্রোত উদ্ধারকাজ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

চীনের পক্ষ থেকে হ্রদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠানো হয়েছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার কারণে সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ ধস ও এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে উন্নত স্যাটেলাইট নজরদারি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, নদীর পানির পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।

হিমালয় অঞ্চলে এর আগেও হিমবাহ ধস ও গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের হুনজা উপত্যকায় হিমবাহের হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। চীন ও তিব্বত অঞ্চলেও এর আগে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপাল ও চীন সীমান্তের নতুন হ্রদটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পর আবারও বড় ধরনের দুর্যোগের মুখে পড়তে পারে ওই অঞ্চল।

সূত্র: আল জাজিরা


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ