ঢাকা    বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ ৩ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

সৌদি নেতৃত্বাধীন নৌ জোটে বাংলাদেশ: সুযোগ ও ঝুঁকি কতটা

সৌদি নেতৃত্বাধীন নৌ জোটে বাংলাদেশ: সুযোগ ও ঝুঁকি কতটা
সংগৃহীত ছবি
ফলো করুন

বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সদস্যদেশ হিসেবে বাংলাদেশের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, সৌদি আরব ছাড়াও তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন ও সুদান এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে তালিকার শেষ দেশটি নিয়ে প্রতিবেদনে অসংগতি রয়েছে। কোনো সূত্রে কোমোরোস এবং কোনো সূত্রে নাইজেরিয়ার নাম এসেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ জোটে যোগদানের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে জোটে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাব্য ভূমিকা স্পষ্ট নয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের হুমকি ও হামলায় ওই পথেও জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বাব আল-মান্দেব হলো ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী একটি সরু সামুদ্রিক পথ। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন উদ্যোগটির লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌপথ, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং জ্বালানি পরিবহন রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্যোগটি রক্ষণাত্মক প্রকৃতির। এর আওতায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, সমন্বিত টহল এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখার কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাসদস্য পাঠিয়েছিল। যুদ্ধের পর কুয়েত পুনর্গঠনেও বাংলাদেশি সেনাসদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সম্ভাব্য এ জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সঙ্গে শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি জড়িত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, বহুজাতিক জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক নৌযুদ্ধ কৌশল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ টহল ও মহড়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো দেশের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও নৌ সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকায় বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি বাজার ও জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। লোহিত সাগরে নিরাপত্তা বাড়লে বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজও উপকৃত হতে পারে।

তবে এ ধরনের জোটে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জে ইউ ভুঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ ইরান কীভাবে নেবে, সেটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

এটি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম না হওয়ায় সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।

ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ এ জোটে কী ভূমিকা পালন করবে, কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে দায়িত্ব কে নেবে এবং সদস্যদের বিমা ও সুযোগ-সুবিধা কী হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

তার মতে, বাংলাদেশকে ইরানের কাছে পরিষ্কার করতে হবে যে সম্ভাব্য অংশগ্রহণ কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; এর উদ্দেশ্য শুধু আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবও অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর জ্বালানির মূল্য, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়তে পারে।

তাদের মতে, বাংলাদেশ এ উদ্যোগে যুক্ত হলে সৌদি আরব ও ইরান—উভয় দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: সৌদি প্রেস এজেন্সি 

ট্যাগ : বাংলাদেশ সৌদি আরব বাব আল-মান্দেব সামরিক জোট

বাংলা ভিউজ

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সৌদি নেতৃত্বাধীন নৌ জোটে বাংলাদেশ: সুযোগ ও ঝুঁকি কতটা

প্রকাশের তারিখ : ০২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সদস্যদেশ হিসেবে বাংলাদেশের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, সৌদি আরব ছাড়াও তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন ও সুদান এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে তালিকার শেষ দেশটি নিয়ে প্রতিবেদনে অসংগতি রয়েছে। কোনো সূত্রে কোমোরোস এবং কোনো সূত্রে নাইজেরিয়ার নাম এসেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ জোটে যোগদানের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে জোটে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাব্য ভূমিকা স্পষ্ট নয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের হুমকি ও হামলায় ওই পথেও জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বাব আল-মান্দেব হলো ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী একটি সরু সামুদ্রিক পথ। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন উদ্যোগটির লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌপথ, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং জ্বালানি পরিবহন রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্যোগটি রক্ষণাত্মক প্রকৃতির। এর আওতায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, সমন্বিত টহল এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখার কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাসদস্য পাঠিয়েছিল। যুদ্ধের পর কুয়েত পুনর্গঠনেও বাংলাদেশি সেনাসদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সম্ভাব্য এ জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সঙ্গে শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি জড়িত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, বহুজাতিক জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক নৌযুদ্ধ কৌশল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ টহল ও মহড়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো দেশের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও নৌ সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকায় বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি বাজার ও জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। লোহিত সাগরে নিরাপত্তা বাড়লে বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজও উপকৃত হতে পারে।

তবে এ ধরনের জোটে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জে ইউ ভুঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ ইরান কীভাবে নেবে, সেটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

এটি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম না হওয়ায় সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।

ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ এ জোটে কী ভূমিকা পালন করবে, কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে দায়িত্ব কে নেবে এবং সদস্যদের বিমা ও সুযোগ-সুবিধা কী হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

তার মতে, বাংলাদেশকে ইরানের কাছে পরিষ্কার করতে হবে যে সম্ভাব্য অংশগ্রহণ কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; এর উদ্দেশ্য শুধু আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবও অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর জ্বালানির মূল্য, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়তে পারে।

তাদের মতে, বাংলাদেশ এ উদ্যোগে যুক্ত হলে সৌদি আরব ও ইরান—উভয় দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: সৌদি প্রেস এজেন্সি 


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ