যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা নবম রাতের মতো পাল্টাপাল্টি বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত হামলার মধ্যেও ইরান যে পাল্টা আঘাত হানার উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ধরে রেখেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন। এর এক দিন পর উত্তর ইরাকে ভূপাতিত একটি ইরানি ড্রোনের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করতে গিয়ে আরও এক মার্কিন সেনা নিহত হন। কয়েকটি হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে অন্তত দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ঘাঁটিটিতে মার্কিন সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আঞ্চলিক ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করেনি। ইরান দাবি করেছে, তাদের হামলায় মার্কিন হেলিকপ্টার ও বিমানঘাঁটির বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তেহরানের এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ অভিযানে ইরানের সামরিক কমান্ড কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণকেন্দ্র, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং জাহাজে হামলা চালানোর ইরানি সক্ষমতা দুর্বল করতেই এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে ইরান বলছে, মার্কিন হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
সংঘাতের বিস্তারের কারণে জর্ডান ও ইরাকের পাশাপাশি কুয়েত, বাহরাইন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে আরও হামলার হুমকিও দিয়েছেন। তেহরানের দাবি, এসব হামলায় বেসামরিক মানুষও হতাহত হচ্ছেন।
অব্যাহত মার্কিন হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপরও তেহরান নিয়মিত পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কতটা দুর্বল হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের কাছে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র, উৎক্ষেপণযন্ত্র এবং কয়েক হাজার একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন রয়েছে। এর একটি অংশ ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত। তবে সংঘাত চলমান থাকায় এসব অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও স্বীকার করেছেন, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা কঠিন। তাঁর ভাষায়, ইরানের রাডার, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা সম্ভব হলেও প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানানো তেহরানের জন্য তুলনামূলক সহজ।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, সম্ভাব্য স্থল অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে তাদের বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রয়েছে। আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই প্রস্তুতি বজায় রাখা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।
আইআরজিসির স্থলবাহিনীর উপকমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুহুল্লাহ নুরি বলেছেন, শত্রুপক্ষের যেকোনো অনুপ্রবেশ দ্রুত নিষ্ক্রিয় করতে ইরানি বাহিনী প্রস্তুত। সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত সতর্কতাকে দেশের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকও কার্যত ভেঙে পড়েছে। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল সামরিক অভিযান বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং স্থায়ী শান্তি ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করা।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের অঙ্গীকার লঙ্ঘন করায় তেহরানও একতরফাভাবে সমঝোতা স্মারকের শর্ত বাস্তবায়ন করবে না। তবে মধ্যস্থতাকারীরা এখনো নতুন প্রস্তাব দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইরান আপাতত প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দেওয়ার কথা জানালেও ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি। তেহরানের ভাষ্য, যুদ্ধ ও কূটনীতি—দুটিকেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ক্রমেই বড় ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
মন্তব্যসমূহ