বিশ্বের অধিকাংশ দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ বৈশ্বিক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
২০০২ সালে এ ধরনের বৈশ্বিক জনমত জরিপ শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে চীনের প্রতি ইতিবাচক জনমত দেখা গেছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত ৩৬টি দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মতামতের ভিত্তিতে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ধারণা জানতে চাওয়া হয়েছিল।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৭টিতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি। ছয়টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে। আর তিনটি দেশে দুই দেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের হার প্রায় সমান।
স্পেন, ইতালি, গ্রিস, কানাডা ও ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিপরীতে পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও ইসরায়েলে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষকেরা জানিয়েছেন, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তায় ওঠানামা দেখা গেছে। তবে আগে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা কমলেও চীন সাধারণত সমপর্যায়ে বা কিছুটা পিছিয়ে থাকত। এবার চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জনমত কমে যাওয়ার কারণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে।
উদাহরণ হিসেবে কানাডার কথা উল্লেখ করেছে পিউ। ২০২৩ সালে দেশটির ৫৭ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন। চীনের ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেড়ে ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব কমে হয়েছে ৩৩ শতাংশ।
ইতালি, স্পেন, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কেও চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাধারণভাবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেশি দেখা গেলেও উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে দেশটির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জনমতের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি। পাকিস্তানে ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা চীনকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। বিপরীতে জাপানে এ হার মাত্র ১১ শতাংশ। বাংলাদেশেও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি পাওয়া গেছে।
বিশ্বনেতাদের প্রতি আস্থার বিষয়েও জরিপে মতামত নেওয়া হয়। এতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি মানুষের আস্থার মাত্রা যাচাই করা হয়েছে।
দুই নেতার প্রতিই সামগ্রিকভাবে আস্থার হার কম। তবে অধিকাংশ দেশে ট্রাম্পের তুলনায় শি জিনপিং বেশি আস্থা পেয়েছেন। পাকিস্তানে শি জিনপিংয়ের প্রতি সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশ মানুষ আস্থা প্রকাশ করেছেন। জাপানে তার প্রতি আস্থার হার মাত্র ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রতি সর্বোচ্চ ৬৮ শতাংশ আস্থা দেখা গেছে ফিলিপাইনে। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে তার প্রতি আস্থার হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩৯ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজ দেশের মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান করে। চীনের ক্ষেত্রে একই মত দিয়েছেন ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা। তবে এ দুই দেশের মধ্যকার ব্যবধান আগের তুলনায় কমেছে।
মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের একটি বড় অংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। চীনের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তা কম।
গবেষকদের মতে, চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির অবনতিও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। তবে মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের প্রতি চীনের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনো রয়েছে। ফলে দেশটির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়লেও চীনা নেতৃত্বের প্রতি আস্থা অনেক দেশে সীমিত রয়ে গেছে।
মন্তব্যসমূহ