পোশাকশিল্পের বিরাজমান সংকট সমাধানে শ্রমিক ও মালিকপক্ষকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে পারস্পরিক গঠনমূলক আলোচনা ও কার্যকর সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, শ্রমিক ও মালিক পরস্পরবিরোধী কোনো পক্ষ নয়; তাই উভয় পক্ষের বাস্তব সংকট ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান জরুরি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) সকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাতের সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলের সংকটজনক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে পোশাক শ্রমিকদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য ন্যূনতম মাসিক মজুরি অবিলম্বে নির্ধারণ এবং তা ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে পূর্ণ কার্যকরের জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন ও নির্বিচার গণগ্রেপ্তার বন্ধ, গাজীপুরে চলমান আন্দোলনে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের পরিবারকে সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসা রাষ্ট্রীয় সহায়তায় নিশ্চিত করার দাবি জানায় দলটি।
লিখিত বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়া এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা অনিশ্চয়তায় পড়ার ঘটনায় জামায়াত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এটি নিছক কোনো সাধারণ মালিক-শ্রমিক বিরোধ নয়; বরং জাতীয় রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে বাজারদর, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও খাদ্যব্যয় লাগামহীন বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ ব্যাংক সুদহার এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কম মূল্যের কারণে মালিকপক্ষও চরম চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো একপক্ষকে উপেক্ষা করে সমাধান সম্ভব নয়।
নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, গত ১ নভেম্বর গঠিত ছয় সদস্যের বোর্ডের প্রথম বৈঠক ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে নিরপেক্ষতা ও প্রতিনিধিত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী সংগঠন ‘বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন’কে বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত না করায় শ্রমিকদের প্রকৃত অধিকার ও ন্যায়বিচার কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
গাজীপুরে আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষে শ্রমিক তৌফিক শেখ নিহতের ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে তিনি এ হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক তদন্ত দাবি করেন। পাশাপাশি কারখানা ভাঙচুর বা জাতীয় সম্পদ ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য আন্দোলন হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলমান অসন্তোষের আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা শ্রমিক লীগের মতো কোনো রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিত নাশকতা বা উসকানি দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সাধারণ আন্দোলনরত শ্রমিকদের ঢালাওভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
শিল্পখাতের নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি জানান, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুর এলাকায় অস্থিরতার কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকট ও অচলাবস্থার কারণে শতাধিক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। সংকট দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারে, যা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে দেবে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার, বিজিএমইএ-বিকেএমইএ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে অবিলম্বে একটি কার্যকর ‘ত্রিপক্ষীয় সংলাপ’ ডাকার আহ্বান জানায় জামায়াত। এছাড়া বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু, বেআইনি ছাঁটাই বন্ধ, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং শ্রমিকদের জন্য ন্যায্যমূল্যে রেশন বা খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তিনি। ‘শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশ বাঁচবে’—এই মূলনীতি সামনে রেখে সবাইকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান জামায়াত নেতা।














মন্তব্যসমূহ