আগামী ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরবেন—এমন ঘোষণা কয়েক দফায় পুনর্ব্যক্ত করেছেন ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। নিজের এই সিদ্ধান্তে তিনি অবিচল রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হলেও, তাঁর এ ঘোষণাকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে গভীর সংশয়, সন্দেহ এবং বহুমুখী প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার এক বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতা, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা বাস্তবে দেশে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রবল সন্দেহ রয়েছে। দেশের ভেতরে বর্তমানে তাঁর দল আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ থাকায় দলটি প্রকাশ্যে কোনো সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারছে না। মাঠপর্যায়ে বিচ্ছিন্ন কিছু ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও রাজনীতির ময়দানে দলটি কার্যত কোণঠাসা ও সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
একই সঙ্গে মাঠে সক্রিয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক এই প্রতিকূলতার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্বতসম আইনি জটিলতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার আদেশ রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীসহ সারাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা ও দুর্নীতির অভিযোগে শত শত নিয়মিত ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। ফলে তিনি যেকোনো উপায়ে দেশে প্রবেশ করা মাত্রই তাঁকে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে ২০১৩ সালের বন্দিবিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হলেও নয়াদিল্লি এখন পর্যন্ত তাতে ইতিবাচক কোনো সাড়া দেয়নি। চুক্তির শর্তানুযায়ী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অজুহাত তুলে প্রত্যর্পণের আবেদন নাকচ করার সুযোগ থাকায় ভারত তাঁকে ফেরত দিতে আগ্রহী নয় বলেই মনে করছেন সাবেক কূটনীতিকরা। অন্যদিকে বৈধ পথে ফিরতে হলে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পাসপোর্ট বা জরুরি ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতে হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুমোদন পাওয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
তবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত দাবি করেছেন, সব ধরনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ঘোষিত সময় অনুযায়ী ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি পরিবার, দলের বিশ্বস্ত নেতৃত্ব এবং ভারত সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে আলোচনা করেছেন এবং দেশে ফেরার সম্ভাব্য সব বিকল্প পথ ও আইনি সুরক্ষার রূপরেখা ঠিক করে রেখেছেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সরকারের দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন কর্মীরা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জন্য উসকানিমূলক তৎপরতায় লিপ্ত হতে পারে। এ কারণে পুরো নিরাপত্তা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব রূপ নেবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে আইনি পদক্ষেপ, বর্তমান বিএনপি সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং ভারতের প্রকাশ্য ভূরাজনৈতিক অবস্থানের ওপর।
সূত্র: বিবিসি বাংলা














মন্তব্যসমূহ