জল্পনা-কল্পনার অবসান: আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, একই সঙ্গে গণভোট

- আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 12
নানা আলোচনা, অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। একইসঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোটেও অংশ নেবেন দেশের প্রায় পৌনে তেরো কোটি ভোটার।
বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এ নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব।
শেরপুর-৩ আসনের এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে ভোট স্থগিত হওয়ায় এবার ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ৭৫৫ জন দলীয় এবং ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা থাকলেও মাঠে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত মিলছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের দুই বছরের মাথায় আবারও জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আনে। এরপর থেকেই দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে চাপ বাড়তে থাকে। লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের বৈঠকের পর নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যায়।
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস রমজানের আগে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন। ডিসেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণার পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই দশকের নির্বাচনী অভিজ্ঞতায় ভোটারদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। ফলে এবারের নির্বাচন ঘিরে প্রত্যাশা যেমন বেশি, তেমনি চ্যালেঞ্জও বড়।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে হাতে গোনা কয়েকটি নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য ছিল। তাই এই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য করা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
তরুণ ভোটারদের প্রভাব
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ তরুণ ভোটার প্রথমবার বা নতুন প্রজন্ম হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। ফল নির্ধারণে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। দায়িত্ব পালন করছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা, যার মধ্যে রয়েছেন প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসাররা।
কঠোর নিরাপত্তা ও ফল ঘোষণা
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৯ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৫০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি পুলিশ, সিসি ক্যামেরা ও বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদাভাবে গণনা হবে। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল টানিয়ে দেওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তারা পোস্টাল ব্যালটসহ সব ফল একত্র করে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করবেন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোট শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হতে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বিগত কয়েকটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর এবারের ভোটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও প্রত্যাশা স্পষ্ট। এখন নজর থাকবে ভোটার উপস্থিতি, ভোটের পরিবেশ এবং ফলাফল ঘোষণার স্বচ্ছতার দিকে। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এই নির্বাচন কতটা মাইলফলক হয়ে ওঠে, সেটিই দেখার বিষয়।
























