ঢাকা ০৬:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালীদের প্রকাশ্যে শাস্তি: চরমোনাই পীর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের হুমকিতেও ভীত নয় ইরান: আরাগচি জামায়াতের মিছিলে যাওয়ায় শিশু সাজ্জাদকে লাথির অভিযোগ, বিএনপি কর্মী গ্রেপ্তার ফজলুর রহমান বিষ খাবেন—প্রমাণে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন: শিবির সভাপতি দুর্নীতির পুরনো চক্র ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে: মামুনুল হক জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন: নাহিদ ইসলাম সমাবেশে শিশির মনিরকে স্বর্ণের দাঁড়িপাল্লা উপহার নির্বাচনের আগের দিন জানানো হবে প্রধান উপদেষ্টার ভোটদানের স্থান-সময় বিএনপিতে যোগ দেওয়া আলোচিত যুবলীগ নেতা অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে ডাকা বিক্ষোভে হাজির পাটওয়ারীই

রেকর্ড ছুঁয়েছে সোনার দাম: কোথায় গিয়ে থামবে?

বাংলা ভিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 29

দেশের সোনার বাজারে যেন আগুন লেগেছে। এক ভরি ভালো মানের সোনা কিনতে এখন ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে। কখনো সকালে এক দাম, দুপুরে গিয়ে আরেক দাম—এই অস্থিরতায় সাধারণ মানুষ থেকে বিনিয়োগকারী সবাই দুশ্চিন্তায়। প্রশ্ন উঠছে, সোনার দামে এই উল্লম্ফন কেন, সংকটটা আসলে কোথায়, আর বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপটই বা কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সোনার বাজারের এই অস্থিরতার মূল কারণ বিশ্ববাজারের টানাপোড়েন। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন সোনার দাম বাড়ে, তখন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস সেই অনুযায়ী দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয় করে। আবার বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশেও তা কমানো হয়। ফলে বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত ওঠানামা করলে দেশের বাজারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারণের দায়িত্ব মূলত বাজুসের হাতে। তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন দর ঘোষণা করে। ২৪ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার জন্য আলাদা আলাদা দাম নির্ধারণ করা হয় এবং সারা দেশে সেই দামেই কেনাবেচা চলে।

দেশে সোনার চাহিদার প্রায় পুরোটা আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশে নিজস্ব কোনো সোনার খনি নেই। ফলে বিদেশ থেকেই সোনা আসে—কখনো বৈধভাবে, কখনো অবৈধ পথে। প্রবাসফেরত যাত্রীরা নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা শুল্ক দিয়ে আনতে পারেন, আবার এর বাইরে চোরাচালানের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ সোনা দেশে ঢোকে বলে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ে। পাশাপাশি পুরোনো গয়না বিক্রি করে তা গলিয়ে নতুন গয়না তৈরিও বাজারে সোনার একটি উৎস।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি একটি অস্থির বা ভোলাটাইল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।

এ অবস্থায় বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডলার বা অন্যান্য মুদ্রার বদলে সোনা কিনে মজুত বাড়াচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আর চাহিদা বাড়লেই দামও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। সুদের হার কম থাকলে ডলার তুলনামূলক সস্তা হয় এবং বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকে ঝোঁকে। আবার সুদের হার বাড়লেও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সোনার চাহিদা কমে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও বাড়ে।

ভবিষ্যতে সোনার দাম কোথায় গিয়ে থামবে—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক বছরে সোনার দাম আরও বাড়তে পারে। কিছু পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার ছাড়াতে পারে, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ৬ হাজার ডলারের কথাও বলা হচ্ছে। যদি এসব পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে দেশের বাজারেও সোনার দাম নতুন নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন বিশ্বরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকবে, ততদিন সোনার বাজার ‘তেজি’ থাকবে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সোনা কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখন সোনা কেনা বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সোনার দামে দ্রুত স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

শেয়ার করুন

রেকর্ড ছুঁয়েছে সোনার দাম: কোথায় গিয়ে থামবে?

আপডেট: রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের সোনার বাজারে যেন আগুন লেগেছে। এক ভরি ভালো মানের সোনা কিনতে এখন ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে। কখনো সকালে এক দাম, দুপুরে গিয়ে আরেক দাম—এই অস্থিরতায় সাধারণ মানুষ থেকে বিনিয়োগকারী সবাই দুশ্চিন্তায়। প্রশ্ন উঠছে, সোনার দামে এই উল্লম্ফন কেন, সংকটটা আসলে কোথায়, আর বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপটই বা কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সোনার বাজারের এই অস্থিরতার মূল কারণ বিশ্ববাজারের টানাপোড়েন। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন সোনার দাম বাড়ে, তখন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস সেই অনুযায়ী দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয় করে। আবার বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশেও তা কমানো হয়। ফলে বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত ওঠানামা করলে দেশের বাজারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারণের দায়িত্ব মূলত বাজুসের হাতে। তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন দর ঘোষণা করে। ২৪ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার জন্য আলাদা আলাদা দাম নির্ধারণ করা হয় এবং সারা দেশে সেই দামেই কেনাবেচা চলে।

দেশে সোনার চাহিদার প্রায় পুরোটা আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশে নিজস্ব কোনো সোনার খনি নেই। ফলে বিদেশ থেকেই সোনা আসে—কখনো বৈধভাবে, কখনো অবৈধ পথে। প্রবাসফেরত যাত্রীরা নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা শুল্ক দিয়ে আনতে পারেন, আবার এর বাইরে চোরাচালানের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ সোনা দেশে ঢোকে বলে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ে। পাশাপাশি পুরোনো গয়না বিক্রি করে তা গলিয়ে নতুন গয়না তৈরিও বাজারে সোনার একটি উৎস।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি একটি অস্থির বা ভোলাটাইল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।

এ অবস্থায় বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডলার বা অন্যান্য মুদ্রার বদলে সোনা কিনে মজুত বাড়াচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আর চাহিদা বাড়লেই দামও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। সুদের হার কম থাকলে ডলার তুলনামূলক সস্তা হয় এবং বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকে ঝোঁকে। আবার সুদের হার বাড়লেও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সোনার চাহিদা কমে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও বাড়ে।

ভবিষ্যতে সোনার দাম কোথায় গিয়ে থামবে—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক বছরে সোনার দাম আরও বাড়তে পারে। কিছু পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার ছাড়াতে পারে, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ৬ হাজার ডলারের কথাও বলা হচ্ছে। যদি এসব পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে দেশের বাজারেও সোনার দাম নতুন নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন বিশ্বরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকবে, ততদিন সোনার বাজার ‘তেজি’ থাকবে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সোনা কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখন সোনা কেনা বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সোনার দামে দ্রুত স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।