১৮-ঊর্ধ্ব সবাইকে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে

- আপডেট: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 8
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহিনী’ বা অনুরূপ কোনো নাম রাখা হবে এবং বাহিনীর বর্তমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে স্থানীয় পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ ও পদায়নের ব্যবস্থা চালু করা হবে, যেখানে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
রোববার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে নাহিদ ইসলাম ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সব তরুণের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি গণপ্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও জানান। তিনি বলেন, বিগত ৫৫ বছরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা একটি ‘বৈষম্যের কাঠামোতে’ পরিণত হয়েছে। এই কাঠামোর বিরুদ্ধেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, যা তিনি ঐতিহাসিক গণবিদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করেন। বৈষম্য দূর করতে এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে দমন-পীড়ন চালিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কেউ কেউ বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলেও এখনও বহু খুনি, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ আত্মগোপনে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এনসিপি সরকার গঠন করলে গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার করেন নাহিদ ইসলাম। তার ভাষায়, কোনো বাহিনী বা পদমর্যাদা অপরাধীদের রক্ষা করতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এনসিপি ক্ষমতায় গেলে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা হবে এবং লুটপাটকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর অধীনে নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, আগের সরকার বাংলাদেশকে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে ফেলেছিল। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। তার দাবি, এতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মমর্যাদাহীন অবস্থানে পড়েছিল। এনসিপি ক্ষমতায় এলে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে, সার্ক পুনর্জীবন, আসিয়ানে যোগদানের উদ্যোগ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের ফলে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উন্নয়নে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ এখনও তৃতীয় প্রজন্মের সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজ ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রকে দায়ী করে বলেন, এনসিপি সরকার গঠন করলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষক যেন মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া পণ্য বিক্রি করতে পারে এবং ভোক্তা ন্যায্যমূল্যে পণ্য পায়—সে ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন তিনি।
বিচার বিভাগ সংস্কারে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতিমুক্ত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ বৈষম্যের অন্যতম কারণ। এ জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা হবে।
ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ, জেলা ও উপজেলায় খাদ্য পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার অঙ্গীকারও করেন তিনি। নারীর অধিকার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা ভবনের নয়, ব্যবস্থাপনার বলে মন্তব্য করে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি। শিক্ষা খাতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ ইসলাম। পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য, সহজ কৃষিঋণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবাসে যাওয়ার খরচ কমিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙার কথাও তার ভাষণে উঠে আসে।






























