জয়ের আশা বিএনপির, ইতিহাসের সেরা ফলের পথে জামায়াত: রয়টার্স

- আপডেট: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 15
দেড় দশকের বেশি সময় পর সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক মাঠে এবার প্রকৃত প্রতিযোগিতার আবহ দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের দৌড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে থাকলেও ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট এবার তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করতে পারে।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রশ্নই নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতির গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় একক রাজনৈতিক প্রভাবের পর বাংলাদেশ এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচনের সময় রাজপথে বিরোধী দলগুলোর উপস্থিতি ছিল প্রায় অনুপস্থিত। কখনো নির্বাচন বর্জন, কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে কার্যত তারা নির্বাচনী মাঠের বাইরে ছিল। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা তরুণদের অনেকেই মনে করছেন, এটি ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন, যেবছর থেকে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের সূচনা হয়েছিল।
এই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করবে বলে ব্যাপক ধারণা রয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ৩০ বছরের কম বয়সী জেনারেশন জেড নেতাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন রাজনৈতিক দলও জামায়াতের সঙ্গে জোটে যুক্ত হয়েছে। যদিও হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও তারা এখনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়ে তার দল সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আত্মবিশ্বাসী।

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে যদি জনগণের স্পষ্ট রায় প্রতিফলিত হয়, তাহলে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে সহায়ক হবে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতায় তৈরি পোশাক খাতসহ বড় শিল্পখাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের জন্য বড় ধাক্কা।
এই নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের ভূমিকাকেও নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে। শেখ হাসিনাকে ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ক্ষমতা হারানোর পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ভারতের প্রভাব কমার প্রেক্ষাপটে বিএনপি তুলনামূলকভাবে দিল্লির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে দেশটি পাকিস্তানের দিকে আরও ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জামায়াতের জেন-জেড মিত্র দলটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের ওপর ‘নয়াদিল্লির আধিপত্য’ তাদের অন্যতম উদ্বেগের জায়গা। তারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। তবে জামায়াত বলছে, তারা কোনো দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয় এবং নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে।

তারেক রহমান জানিয়েছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে যে দেশ বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি। এর পরেই রয়েছে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আকর্ষণের পেছনে মূল কারণ তাদের তুলনামূলক ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’; ধর্মীয় পরিচয় নয়। জরিপে দেখা গেছে, ভোটাররা ধর্মীয় বা প্রতীকি ইস্যুর চেয়ে দুর্নীতি দমন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা দায়িত্বশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন।
সব মিলিয়ে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে পরবর্তী সরকারপ্রধান হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে যায়, তাহলে তাদের চেয়ারম্যান ডা. শফিকুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী পদে আলোচনায় থাকতে পারেন।
২১ বছর বয়সী প্রথমবারের ভোটার মোহাম্মদ রাকিব বলেন, তিনি আশা করেন নতুন সরকার জনগণের মতপ্রকাশ ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ শাসনে মানুষ ভোট দিতে পারত না, কথা বলার সুযোগও ছিল না। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, আমি চাই তারা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করুক।”

























