ঢাকা ০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালীদের প্রকাশ্যে শাস্তি: চরমোনাই পীর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের হুমকিতেও ভীত নয় ইরান: আরাগচি জামায়াতের মিছিলে যাওয়ায় শিশু সাজ্জাদকে লাথির অভিযোগ, বিএনপি কর্মী গ্রেপ্তার ফজলুর রহমান বিষ খাবেন—প্রমাণে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন: শিবির সভাপতি দুর্নীতির পুরনো চক্র ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে: মামুনুল হক জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন: নাহিদ ইসলাম সমাবেশে শিশির মনিরকে স্বর্ণের দাঁড়িপাল্লা উপহার নির্বাচনের আগের দিন জানানো হবে প্রধান উপদেষ্টার ভোটদানের স্থান-সময় বিএনপিতে যোগ দেওয়া আলোচিত যুবলীগ নেতা অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে ডাকা বিক্ষোভে হাজির পাটওয়ারীই

যে ৮টি কারণে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান

বাংলা ভিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 15

হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর বাড়তে থাকা জনসমর্থন। গত দেড় বছরে ইসলামপন্থী দলটির উত্থান অনেকটাই অপ্রত্যাশিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটও নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ দিকে জামায়াত ছিল চরম কোণঠাসা অবস্থায়। শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ কারাগারে ছিলেন, দলীয় কার্যক্রম চলত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবে দলটি কখনোই বড় গণভিত্তিসম্পন্ন শক্তি ছিল না। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ প্রায় ১২ শতাংশ ভোট পেলেও এরপর আর সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে থাকা বিতর্ক দীর্ঘদিন তাদের রাজনীতির বড় বাধা হয়ে ছিল।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতের এই অগ্রযাত্রার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রথমত, ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব অনেক ভোটারের কাছে আগের মতো কার্যকর নেই। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়েছে আগের সরকারের সময়, ফলে বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র দেখছেন না অনেকেই। পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের কাছে ওই সময়কাল বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের তুলনায় কম প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির সঙ্গে দূরত্বের ধারণা জামায়াতের পক্ষে কাজ করছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর অনেক এলাকায় ক্ষমতার হাতবদল হলেও চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ হয়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় জামায়াতকে তুলনামূলকভাবে ‘পরিষ্কার’ দল হিসেবে দেখছেন একাংশ ভোটার।

তৃতীয়ত, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় উপস্থিতি দলটির ভাবমূর্তি শক্ত করেছে। সরকার পতনের পর নিহত ও আহতদের পরিবারে সংগঠিতভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা জামায়াতকে একটি সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

চতুর্থত, শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো তাদের বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে জামায়াত তৃণমূল পর্যায়ে ঘরে ঘরে গিয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেছে, যা অনেক এলাকায় কার্যকর প্রভাব ফেলেছে।

পঞ্চমত, সাম্প্রতিক সময়ে দলটি নিজেদের তুলনামূলক উদার ও মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। ধর্মীয় এজেন্ডার বদলে দুর্নীতি দমন, সুশাসন ও জবাবদিহিতার মতো বিষয় সামনে এনে তারা নতুন ভোটারদের আকর্ষণ করছে।

ষষ্ঠত, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে যারা বিএনপিকে ভোট দিতেন, তারা এখন নির্দ্বিধায় জামায়াতকে সমর্থন দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সপ্তমত, ভারতবিরোধী মনোভাবের বিস্তারও জামায়াতের পক্ষে কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সীমান্ত হত্যা ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানা ইস্যুতে ক্ষোভের সুযোগ নিতে পারছে দলটি।

অষ্টমত, ‘পরিবর্তনকামী’ শক্তি হিসেবে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তি ও দুর্নীতিবিরোধী মনোভাবের মধ্যে অনেক ভোটার দলটিকে প্রথাগত ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখছেন।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর এই উত্থান সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটির বাড়তে থাকা জনসমর্থন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শেয়ার করুন

যে ৮টি কারণে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান

আপডেট: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর বাড়তে থাকা জনসমর্থন। গত দেড় বছরে ইসলামপন্থী দলটির উত্থান অনেকটাই অপ্রত্যাশিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটও নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ দিকে জামায়াত ছিল চরম কোণঠাসা অবস্থায়। শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ কারাগারে ছিলেন, দলীয় কার্যক্রম চলত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবে দলটি কখনোই বড় গণভিত্তিসম্পন্ন শক্তি ছিল না। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ প্রায় ১২ শতাংশ ভোট পেলেও এরপর আর সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে থাকা বিতর্ক দীর্ঘদিন তাদের রাজনীতির বড় বাধা হয়ে ছিল।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতের এই অগ্রযাত্রার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রথমত, ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব অনেক ভোটারের কাছে আগের মতো কার্যকর নেই। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়েছে আগের সরকারের সময়, ফলে বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র দেখছেন না অনেকেই। পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের কাছে ওই সময়কাল বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের তুলনায় কম প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির সঙ্গে দূরত্বের ধারণা জামায়াতের পক্ষে কাজ করছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর অনেক এলাকায় ক্ষমতার হাতবদল হলেও চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ হয়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় জামায়াতকে তুলনামূলকভাবে ‘পরিষ্কার’ দল হিসেবে দেখছেন একাংশ ভোটার।

তৃতীয়ত, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় উপস্থিতি দলটির ভাবমূর্তি শক্ত করেছে। সরকার পতনের পর নিহত ও আহতদের পরিবারে সংগঠিতভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা জামায়াতকে একটি সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

চতুর্থত, শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো তাদের বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে জামায়াত তৃণমূল পর্যায়ে ঘরে ঘরে গিয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেছে, যা অনেক এলাকায় কার্যকর প্রভাব ফেলেছে।

পঞ্চমত, সাম্প্রতিক সময়ে দলটি নিজেদের তুলনামূলক উদার ও মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। ধর্মীয় এজেন্ডার বদলে দুর্নীতি দমন, সুশাসন ও জবাবদিহিতার মতো বিষয় সামনে এনে তারা নতুন ভোটারদের আকর্ষণ করছে।

ষষ্ঠত, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে যারা বিএনপিকে ভোট দিতেন, তারা এখন নির্দ্বিধায় জামায়াতকে সমর্থন দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সপ্তমত, ভারতবিরোধী মনোভাবের বিস্তারও জামায়াতের পক্ষে কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সীমান্ত হত্যা ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানা ইস্যুতে ক্ষোভের সুযোগ নিতে পারছে দলটি।

অষ্টমত, ‘পরিবর্তনকামী’ শক্তি হিসেবে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তি ও দুর্নীতিবিরোধী মনোভাবের মধ্যে অনেক ভোটার দলটিকে প্রথাগত ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখছেন।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর এই উত্থান সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটির বাড়তে থাকা জনসমর্থন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।