মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তার ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কিছু বিশ্লেষক। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ট্রাম্পের ভাষণ, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক এবং ইরান, ইউক্রেন ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তার নীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে রাজি না হলে কঠোর পরিণতির হুমকি দেন। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বিষয়ে তার কঠোর অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘বিজয়ীরাই লুটের মাল পায়।’ আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিতও দেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের এমন অবস্থানের বিপরীতে বিভিন্ন দেশের নেতাদের কাছ থেকে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া এসেছে। ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের অনেকে ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিশ্বকে ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। শক্তি ও জবরদস্তির পরিবর্তে তিনি ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ’-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও বিদেশি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, তার দেশের জলসীমায় বিমানবাহী রণতরীর পরিবর্তে অপরাধে অর্থ ও অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধে সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ইরান যুদ্ধকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে মিলে শুরু হওয়া এই সংঘাত প্রায় সাত মাস ধরে চলার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং সংঘাত ইয়েমেন ও লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনসমর্থনের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্যেও বৈঠকের দৃশ্যমান ফল হিসেবে দুই দেশের বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে শি জিনপিং ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাইওয়ান ইস্যু ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়।
ট্রাম্পের আগের শুল্কনির্ভর কঠোর নীতির তুলনায় এবার তার অবস্থান তুলনামূলকভাবে নমনীয় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এর পেছনে চীনের বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণকে একটি কারণ হিসেবে দেখছেন। প্রযুক্তি ও গাড়ি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এসব খনিজের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে তাদের মত।
ইউক্রেন যুদ্ধেও ট্রাম্পের উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত পরিসরে জ্বালানি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও বড় কোনো ফল দেয়নি।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও ট্রাম্পের আগের অবস্থান ও পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা হলেও তা ট্রাম্পের আগের ‘মালিকানা’ নেওয়ার দাবির তুলনায় অনেক সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিতে থাকায় নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার বলেন, এক বছর আগে খুব কম দেশই ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করার সাহস দেখাত। এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তাকে ‘না’ বলতে বেশি আগ্রহী।
তবে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি থমকে যাওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ‘লোক দেখানো অবস্থান নিয়ে চিন্তিত নন, বরং ফলাফল নিয়ে চিন্তিত’। তার দাবি, বিশ্বনেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় তাদের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে।