ঢাকা    শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

চীন-মিশর সম্পর্কের ৭০ বছর, অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

চীন-মিশর সম্পর্কের ৭০ বছর, অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
ছবি : সংগৃহীত
ফলো করুন

চীন ও মিশরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তির সময়ে দুই দেশের অংশীদারিত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১ ও ২ তারিখে মিশরে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সফরটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও গভীর করার বার্তা দিয়েছে। 

পশ্চিমা বিশ্লেষণের একটি অংশ এই সফরকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিপরীতে চীনের অবস্থান শক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তবে চীন-মিশর সম্পর্কের ভিত্তি শুধু পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক দশকে শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বাণিজ্যে দুই দেশের বাস্তব সহযোগিতা এই সম্পর্ককে শক্ত ভিত দিয়েছে।

এর অন্যতম বড় উদাহরণ চীন-মিশর টেডা সুয়েজ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড কো-অপারেশন জোন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছিল। বিনিয়োগের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৩৮০ কোটি ডলার এবং স্থানীয়ভাবে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। 

সুয়েজ খালকে ঘিরে মিশরের কৌশলগত অবস্থান এই শিল্পাঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বিকাশের পাশাপাশি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণেও এটি ভূমিকা রাখছে।

অবকাঠামো খাতেও চীনের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। নতুন প্রশাসনিক রাজধানী ও পূর্ব কায়রোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে লাইট রেল প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উদ্যোগে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় দুই দেশ শিল্প, প্রযুক্তি, নতুন জ্বালানি, অর্থনীতি ও বিনিয়োগে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। 

প্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতা বাড়ছে। মিশরের স্যাটেলাইট কর্মসূচিতে চীনের কারিগরি সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো EgyptSat-2। স্যাটেলাইটটি ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর চীন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং এর মাধ্যমে মিশর রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। 

শি জিনপিংয়ের এবারের সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উৎপাদন, অবকাঠামো, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নতুন জ্বালানি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। 

তবে এই সম্পর্কের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মধ্যে মিশর যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও বৈচিত্র্যময় করছে। অন্যদিকে চীনও মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। 

তাই চীন-মিশর সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। কায়রোর জন্য চীনা বিনিয়োগ শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে। আর বেইজিংয়ের জন্য মিশর হয়ে উঠছে আফ্রিকা, আরব বিশ্ব ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

৭০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের এই পর্যায়ে তাই চীন-মিশর অংশীদারিত্বের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক স্বার্থ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সমন্বয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে এই সম্পর্ক দুই দেশের নিজস্ব স্বার্থ ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্র: রয়টার্স

ট্যাগ : শি জিনপিং মিশর চীন মিশর সুয়েজ খাল

বাংলা ভিউজ

শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


চীন-মিশর সম্পর্কের ৭০ বছর, অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

চীন ও মিশরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তির সময়ে দুই দেশের অংশীদারিত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১ ও ২ তারিখে মিশরে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সফরটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও গভীর করার বার্তা দিয়েছে। 

পশ্চিমা বিশ্লেষণের একটি অংশ এই সফরকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিপরীতে চীনের অবস্থান শক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তবে চীন-মিশর সম্পর্কের ভিত্তি শুধু পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক দশকে শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বাণিজ্যে দুই দেশের বাস্তব সহযোগিতা এই সম্পর্ককে শক্ত ভিত দিয়েছে।

এর অন্যতম বড় উদাহরণ চীন-মিশর টেডা সুয়েজ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড কো-অপারেশন জোন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছিল। বিনিয়োগের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৩৮০ কোটি ডলার এবং স্থানীয়ভাবে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। 

সুয়েজ খালকে ঘিরে মিশরের কৌশলগত অবস্থান এই শিল্পাঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বিকাশের পাশাপাশি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণেও এটি ভূমিকা রাখছে।

অবকাঠামো খাতেও চীনের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। নতুন প্রশাসনিক রাজধানী ও পূর্ব কায়রোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে লাইট রেল প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উদ্যোগে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় দুই দেশ শিল্প, প্রযুক্তি, নতুন জ্বালানি, অর্থনীতি ও বিনিয়োগে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। 

প্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতা বাড়ছে। মিশরের স্যাটেলাইট কর্মসূচিতে চীনের কারিগরি সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো EgyptSat-2। স্যাটেলাইটটি ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর চীন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং এর মাধ্যমে মিশর রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। 

শি জিনপিংয়ের এবারের সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উৎপাদন, অবকাঠামো, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নতুন জ্বালানি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। 

তবে এই সম্পর্কের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মধ্যে মিশর যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও বৈচিত্র্যময় করছে। অন্যদিকে চীনও মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। 

তাই চীন-মিশর সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। কায়রোর জন্য চীনা বিনিয়োগ শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে। আর বেইজিংয়ের জন্য মিশর হয়ে উঠছে আফ্রিকা, আরব বিশ্ব ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

৭০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের এই পর্যায়ে তাই চীন-মিশর অংশীদারিত্বের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক স্বার্থ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সমন্বয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে এই সম্পর্ক দুই দেশের নিজস্ব স্বার্থ ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্র: রয়টার্স


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ