নির্বাচনি রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জটিল আবর্তে একই সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্প যেমন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিজের ডানপন্থি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছেন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফরেন পলিসি, সিএনএন, দ্য হিল ও হারেৎজের যৌথ বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহু মূলত একই সঙ্গে দুটি দিক থেকে চরম আঘাতের শিকার হয়েছেন। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি (৩৮০ কোটি) মার্কিন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের এক আকস্মিক ও বিতর্কিত ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০২৮ সাল পর্যন্ত এ সহায়তা নিশ্চিত থাকার কথা ছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন একে একতরফা ‘সহায়তা-নির্ভর’ সম্পর্কের বদলে ‘অস্ত্র ক্রয় ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব-নির্ভর’ মডেলে রূপান্তরের যুক্তি দেখাচ্ছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফরেন পলিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলকে লাগাতার সামরিক সহায়তা পাঠানো মার্কিন মধ্যবিত্ত ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে গড়ে প্রতিটি মার্কিন পরিবারকে অতিরিক্ত ২ হাজার ডলার গুনতে হয়েছে, যার খেসারত ট্রাম্পের দলকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দিতে হয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলে সামরিক সাহায্য বন্ধ বা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ সামাল দিতেই ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে সহায়তা বন্ধের কৌশল বেছে নেন, যা তেল আবিব ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে হতবাক করে দিয়েছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম হারেৎজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গাজা, লেবানন ও ইরানে একযোগে চলমান যুদ্ধের মুখে মার্কিন সামরিক সহায়তা স্থগিত হওয়া ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোলাবারুদের জোগান এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সামরিক দুর্বলতা ও ঝুঁকির সংকেত তৈরি করেছে। যদিও সহায়তা বন্ধ হলেও নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত স্বনির্ভর ‘সুপার স্পার্টা ইসরাইল’ ধারণার আওতায় দেশটি নিজ অর্থে অস্ত্র কিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ উৎপাদনের পথে যেতে পারে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে এই ধাক্কা দেশটির কৌশলগত অবস্থানকে নড়বড়ে করে তুলবে।
অন্যদিকে দ্য হিল তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়নে জানিয়েছে, নির্বাচনের ফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে নেতানিয়াহু-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ইসরায়েলে বেশ শক্তিশালী। বিরোধী দলগুলো যদি পারস্পরিক বিভেদ মিটিয়ে একটি স্থিতিশীল বিকল্প জোট সরকার গঠনে একমত হতে পারে, তবে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটবে। তবে আরব দলগুলোর সাথে জোট গঠন নিয়ে ইহুদি বিরোধী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে নতুন সরকার গঠনের আলোচনা কয়েক সপ্তাহ ঝুলে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ব্লুমবার্গ। সার্বিকভাবে নেতানিয়াহুর অতিমাত্রায় ট্রাম্প-নির্ভর যুদ্ধনীতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় ঐকমত্যকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা কিংবা শান্তির পথে ফেরার পুরো সমীকরণকেই নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্র: সিএনএন














মন্তব্যসমূহ