দেশে খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কৌশল প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি বলেছেন, খাদ্য অপচয় রোধ করা শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, শিল্প ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল শেরাটনে আয়োজিত ‘সেভ ফুড, সিকিউর বাংলাদেশ’স ফুড ফিউচার: ন্যাশনাল ডায়ালগ অন লস অ্যান্ড ওয়াস্ট’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিট এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশ কার্যালয় যৌথভাবে সংলাপের আয়োজন করে।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, খাদ্য অপচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
তিনি জানান, সংলাপ ও আলোচনার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগের সুফল যেন সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আফরোজা খানম বলেন, খাদ্য অপচয় কমানোর অর্থ কেবল খাবার বাঁচানো নয়। এর সঙ্গে কৃষকের পরিশ্রমের মূল্যায়ন, জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।
খাদ্য উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে ক্ষতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, উৎপাদিত খাদ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে খাদ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনব্যবস্থায় অপচয় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্য অপচয় রোধে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
খাদ্যমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, খাদ্য উৎপাদক ও সাধারণ ভোক্তাদের সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখতে হবে।
সংলাপে খাদ্য অপচয় ও ক্ষতির বৈশ্বিক পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়।
অন্যদিকে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) হিসাবে, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে পরিবার, খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে।
খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি কমানো জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১২ দশমিক ৩ অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি। তিনি খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি কমাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। স্বাগত বক্তব্য দেন ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের মহাপরিচালক মো. মাহাবুবুর রহমান।
এ ছাড়া মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল আলম, অধ্যাপক নওশাদ আলম ও ড. এম. খালেকুজ্জামান।
তাঁরা খাদ্য অপচয়ের কারণ, ক্ষতি কমানোর চ্যালেঞ্জ এবং কার্যকর কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।
সংলাপে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, খাদ্য ও পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, দেশি-বিদেশি গবেষক এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, খাদ্য অপচয় রোধে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হলে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ যত শক্তিশালী হবে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও তত কার্যকর হবে।
মন্তব্যসমূহ