ঢাকা    বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৬১৩ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত

ঘরভর্তি মেহমানের জন্য রাতের খাবার রান্না করছিলেন রোজিনা আক্তার (৩৫)। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। রান্নাও প্রায় শেষ। স্বামী মুজিবুর রহমান বাড়ি ফিরলেই সবাই একসঙ্গে খেতে বসবেন।আনন্দঘন সেই প্রস্তুতির মধ্যেই হঠাৎ পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে রান্নাঘরের ওপর। মুহূর্তেই মাটিচাপা পড়েন রোজিনা। ঘরে থাকা মেহমান, প্রতিবেশী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করেন।গত ১১ জুলাই রাত ৯টার দিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের কলাতলী ঝিরঝিরিপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।শুধু রোজিনা নন, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টি, পাহাড়ধস, বন্যা ও দেয়ালধসে কক্সবাজারে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।পাহাড়ধসে ১৩ রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদের মৃত্যু হয়েছে বন্যার পানিতে ভেসে, পানিতে ডুবে এবং দেয়ালধসের ঘটনায়।৯ দিনে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি[BANGVIEWS-POST:1954]কক্সবাজারে নয় দিনে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে জেলার ১০ উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। পানিবন্দী হয়ে পড়েন অন্তত আড়াই লাখ মানুষ।পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল ও অস্বাভাবিক জোয়ারে ক্ষয়ক্ষতির পর এখন মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা।জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও বন্যায় জেলায় অন্তত ১ হাজার ৬১৩টি বাড়িঘর এবং ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায়।পেকুয়ার ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিতচকরিয়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৩০০টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। সেখানে একজনের মৃত্যু এবং ১৯০টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।পেকুয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৪৫০টি বাড়িঘর ও ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।পুনর্বাসনের পরিকল্পনাকক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের তালিকা তৈরি করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা করে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১৬ জুলাইয়ের হালনাগাদ তথ্যে কক্সবাজারে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ৩২ বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। এ হিসাবে আগের তথ্যের পর আরও একজনের মৃত্যু যুক্ত হয়েছে।রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি[BANGVIEWS-POST:1953]জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুলাই রাত থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন নিহত ও ১৮ জন আহত হয়েছেন। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৬ হাজার ১১৯ জন। সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৪ হাজার ৩০৭ জন।এ সময় ক্যাম্পগুলোতে ২৮৬টি আবহাওয়াজনিত দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৯৫টি ভূমিধস, ১৫৬টি ঝোড়ো হাওয়া এবং ২১টি বন্যার ঘটনা রয়েছে।টানা বৃষ্টিতে ২ হাজার ৮০৯টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক এবং ১৩টি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষাকেন্দ্র, চিকিৎসাকেন্দ্র, পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতির মুখে পড়েছে।কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরানোর কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি পাহাড়ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ক্যাম্পে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।বৃষ্টি কমলেও কক্সবাজারের দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। নদীভাঙন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও খাবার পানির সংকটে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন হাজারো মানুষ।

কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৬১৩ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত