ইরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাত করাই তাঁর দেশের ‘প্রধান লক্ষ্য’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের মুখে বিভিন্ন জনমত জরিপে জনসমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধের এই কড়া বার্তা দিলেন। তবে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অবকাঠামোতে বড় ধরনের সামরিক আঘাত হানার সক্ষমতা ইসরায়েলের থাকলেও কেবল বোমাবর্ষণ করে একটি শক্তিশালী দেশের শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার কোনো বাস্তবসম্মত ও সুস্পষ্ট কৌশল তেলআবিবের নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের তেলআবিব সফরের পর নেতানিয়াহু এই সরকার উৎখাতের এজেন্ডা প্রকাশ্যে আনেন। তবে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, ইরানে এখনই নতুন করে যৌথ হামলা চালানোর ইসরায়েলি প্রস্তাবে সরাসরি সম্মতি দেননি ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের সমীকরণ এবং আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ওয়াশিংটনকে আপাতত সতর্ক অবস্থানে রেখেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষক আরবান কনিংহামের মতে, ইসরায়েলের আধুনিক আক্রমণাত্মক অস্ত্র এবং যুদ্ধবিমানে মাঝআকাশে জ্বালানি ভরার ব্যবস্থা দেশটিকে ইরানের আকাশসীমায় কৌশলগত সুবিধা দেয়। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বা সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ স্থাপনায় মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান থেকে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘জিবিইউ-৫৭’ বাঙ্কারবিধ্বংসী যে বোমা ফেলা হয়েছিল, এককভাবে সেই পর্যায়ের হামলা চালানোর প্রযুক্তি বা সমরাস্ত্র ইসরায়েলের হাতে নেই।
তাছাড়া কেবল বিমান হামলা দিয়ে সরকার পতন যে সম্ভব নয়, তা গত মার্চে নেতানিয়াহু নিজেও স্বীকার করেছিলেন। তুরস্কের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চাগলার কুরচ উল্লেখ করেন, কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে বিপুল স্থলসেনা মোতায়েন করে অবস্থান বজায় রাখতে হয়। ইরানের মতো বিশাল আয়তন, বৈরী ভূপ্রকৃতি এবং সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর দেশে ইসরায়েলের পক্ষে একা স্থল অভিযান চালানো বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এমনকি কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে আইআরজিসির মতো সুপ্রশিক্ষিত বাহিনীকে পরাস্ত করার আশাও বাস্তবসম্মত নয়।
অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিও মারাত্মক। রুসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল জানান, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণের কিছুটা ক্ষতি হলেও ইরানের হাতে প্রচুর ব্যালিস্টিক ও জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির সস্তা আক্রমণাত্মক ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে ইসরায়েলের অত্যন্ত ব্যয়বহুল অ্যারো বা ডেভিডস স্লিংয়ের মতো আকাশ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার তীব্র আর্থিক ও সামরিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সমরবিদদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো—ইসরায়েল হয়তো ইরানের সামরিক ঘাঁটিতে বড় ক্ষতি করতে পারবে, কিন্তু সেই বোমাবর্ষণকে রাজনৈতিক வெற்றিতে রূপান্তর করে তেহরানের শাসনব্যবস্থা বদলানো প্রায় অসম্ভব।
সূত্র: আল জাজিরা
মন্তব্যসমূহ