ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও দাঙ্গা নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তাঁর অভিযোগ, কিছু বিশ্বনেতা নিজেদের নির্বাচনী স্বার্থে ফ্রান্সের অস্থিরতাকে ব্যবহার করছেন। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিওর ওপর নির্ভর করেও কেউ কেউ বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) কাতারের রাজধানী দোহায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব মন্তব্য করেন ম্যাক্রোঁ। তাঁর সমালোচনাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি কটাক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে সহিংসতা, দোকানপাটে হামলা এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়।
বিক্ষোভের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। ট্রাম্প ফ্রান্সের অস্থিরতার সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু দাবি করেন, ফ্রান্স উগ্র ইসলামপন্থিদের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
তবে দুই নেতার এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ম্যাক্রোঁ।
দোহায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ফ্রান্সের ঘটনাগুলো নিয়ে বিদেশ থেকে তথ্যের কারসাজি করা হয়েছে। এর ফলেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিদেশি নেতার কাছ থেকে অগ্রহণযোগ্য এবং বোকামিপূর্ণ মন্তব্য এসেছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, দাঙ্গার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এমন কিছু ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, যেগুলোতে বাস্তবে না ঘটা দৃশ্য দেখানো হয়েছে।
এসব ভিডিও দেখে বিদেশি নেতারাও বিভ্রান্ত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘কিছু মানুষ ব্যাখ্যা করেছেন, আমরা অভিবাসী ও ইসলামপন্থিদের আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।’
তাঁর দাবি, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ সময় তিনি সরাসরি ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহুর নাম উল্লেখ না করলেও আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি নেতাদের ফ্রান্সবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
ম্যাক্রোঁ অভিযোগ করেন, নির্বাচনী প্রচারে থাকা কিছু নেতা কখনো সরল বিশ্বাসে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া তথ্য পুনরাবৃত্তি করছেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারণার স্বার্থে ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে ব্যবহার করছেন।
তাঁর এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে রয়েছে আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন এবং ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন।
এর আগে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহু ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে উগ্র ইসলামপন্থিদের আগ্রাসনের সঙ্গে যুক্ত করেন। অন্যদিকে ট্রাম্প দেশটির সহিংসতার পেছনে অভিবাসনের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মেরিন লো পেনের প্রশংসা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে ফরাসি কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক সহিংসতার জন্য অভিবাসী বা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার মতো কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি।
ম্যাক্রোঁ বলেন, এ ধরনের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় কারা ফ্রান্সকে ভালোবাসেন আর কারা দেশটিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চান।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক চলার মধ্যেই বিদেশি নেতাদের এ ধরনের মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
সূত্র: এএফপি, রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ