দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তে নতুন অস্ত্রসজ্জিত সেনা ইউনিট মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। নতুন ইউনিটগুলো এরই মধ্যে গোলাবর্ষণের উপযোগী অবস্থানে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছে পিয়ংইয়ং। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা চালাতে সীমান্তজুড়ে আবারও লাউডস্পিকার চালুর পরিকল্পনা জানিয়েছে দেশটি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং এসব তথ্য জানান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
কিম ইয়ো জং জানান, উত্তর কোরিয়ার সামরিক ইউনিটগুলো নতুন অবস্থানে যাচ্ছে। অক্টোবর মাসের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়াকে লক্ষ্য করে পুরো সীমান্তে মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার লাউডস্পিকার চালু করা হবে।
এর আগে সীমান্তবর্তী সেনা অবস্থান ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো পরিদর্শন করেন কিম ইয়ো জং এবং উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর মার্শাল পাক জং চন। এই পরিদর্শনের পর নতুন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি সামনে আসে।
উত্তর কোরিয়ার সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন অস্ত্রসজ্জিত ইউনিটগুলো ইতোমধ্যে গোলাবর্ষণ চালানোর উপযোগী অবস্থান গ্রহণ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াকে এই সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার বার্তাও দিয়েছে পিয়ংইয়ং।
মার্শাল পাক জং চন সীমান্তে মোতায়েন সেনাদের শক্তিশালী গোলাবর্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা উত্তর কোরিয়ার বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করলে দ্রুত ও শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুই দেশের সীমান্তে গত মাস থেকেই উত্তেজনা বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিএমজেডে একটি বিস্ফোরণের পেছনে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা স্থলমাইন দায়ী। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে পিয়ংইয়ং।
এদিকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতার পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সিউলের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া নতুন করে উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিলে তার দৃঢ় জবাব দেওয়া হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর দাবি, সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা মোকাবিলায় সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণ এবং লাউডস্পিকার ব্যবহার বৈধ আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া এসব কার্যক্রমকে উসকানি হিসেবে দেখছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জিন ইয়ং-সুং সেনাবাহিনীকে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে উত্তর কোরিয়া আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে পারে।
সীমান্তে সেনাদের নতুন অবস্থান গ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বিশ্লেষকেরাও।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং সুং-পিয়োর মতে, উত্তর কোরিয়া সীমান্তের ছোট সামরিক চৌকি ও ব্যক্তিগত অস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের অবস্থান আরও সামনে এগিয়ে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
তাঁর মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম গুরুতর সামরিক অগ্রগতি। অতীতে উত্তর কোরিয়া বিভিন্ন অস্ত্রের সক্ষমতা প্রদর্শন করলেও এবার সেনাদের কার্যকর যুদ্ধের অবস্থানে মোতায়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এর মধ্যেই উত্তর কোরিয়া নতুন ধরনের নির্ভুল নিশানাভিত্তিক টর্পেডো ব্যবস্থা এবং মধ্যপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। দেশটির দাবি, এসব অস্ত্রের প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সেই প্রযুক্তির প্রকৃত সক্ষমতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সীমান্তে লাউডস্পিকার প্রচারণা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে পুরোনো বিরোধ রয়েছে।
কোরীয় যুদ্ধের সময় থেকেই সীমান্তে মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার জন্য লাউডস্পিকার ব্যবহার করে আসছে উভয় পক্ষ। ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় ময়লা-আবর্জনাভর্তি হাজার হাজার বেলুন পাঠায়। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি ছিল, দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু কর্মীর উত্তর কোরিয়াবিরোধী প্রচারণার জবাবে ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
পরে দক্ষিণ কোরিয়া ছয় বছর পর সীমান্তে লাউডস্পিকার সম্প্রচার পুনরায় চালু করে। এসব সম্প্রচারে কে-পপ সংগীত ও আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রচার করা হতো।
জবাবে উত্তর কোরিয়াও সীমান্তের ওপার থেকে বিভিন্ন ধরনের শব্দ সম্প্রচার শুরু করে। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা অস্বস্তিতে পড়েন।
পরবর্তীতে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ হিসেবে গত বছর দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্ত থেকে নিজেদের লাউডস্পিকার সরিয়ে নেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পূর্বশর্ত ছাড়াই সংলাপ শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু সীমান্তে নতুন সামরিক ইউনিট মোতায়েন ও লাউডস্পিকার চালুর ঘোষণায় দুই দেশের সম্পর্ক আবারও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার নতুন ইউনিটগুলোতে কতজন সেনা রয়েছেন এবং কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সূত্র: এএফপি।
মন্তব্যসমূহ