জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ভাষণের প্রশংসা করে তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবন থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। অভিনন্দন বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দূরদর্শী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। তার এ ভাষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদেরও স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাতের কারণে বহু দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন। যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। জাতিসংঘকে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমঝোতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর ফলে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত বলে উল্লেখ করে তাদের নিরাপদে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সমর্থন চান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলক কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রত্যাশা করেন তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও ভাষণে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ক্লিন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও ভাষণে তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসানের পর বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। দেশ পুনর্গঠনে সরকার ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’—থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে বলে জানান তিনি।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথা ভাষণে উল্লেখ করেন তিনি।
নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড চালুর কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব কার্ডকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার ওপর সরকারের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার কর্মসূচির পাশাপাশি খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। তবে প্রযুক্তির সুযোগ সবার জন্য সমান না হলে বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবেন এবং শিশুরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে। জনগণের নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ।’ জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রমাণসহ সূত্র: শুক্রবার বঙ্গভবন থেকে পাঠানো রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন বার্তা এবং ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ভাষণের পূর্ণ পাঠ।
তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতিসংঘ, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি