ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার একটি ব্যর্থ উদ্যোগে পোল্যান্ডের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জ্বালানি কোম্পানি অর্লেনের সুইস বাণিজ্যিক শাখা প্রায় ২৩ কোটি ডলার হারিয়েছে বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, অগ্রিম অর্থ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর জটিল লেনদেনের মাধ্যমে চুক্তিটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটির অনুসন্ধান প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে পোল্যান্ডে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ঘটনাটিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ ঘটনা প্রকাশ পোল্যান্ডের জন্য লজ্জাজনক। তিনি সাবেক ল অ্যান্ড জাস্টিস বা পিআইএস সরকারের সময়কার ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন।
ঘটনার সময় অর্লেনের প্রধান নির্বাহী ছিলেন দানিয়েল ওবায়েতেক। বর্তমানে তিনি বিরোধী পিআইএসের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ দিকে অর্লেন ট্রেডিং সুইজারল্যান্ড বা ওটিএস প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল কেনার চুক্তি করেছিল। চুক্তিটির মূল্য ছিল প্রায় ৩৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মধ্যে প্রায় ২৩ কোটি ডলার অগ্রিম দেওয়া হয়।
লেনদেনে দুবাইভিত্তিক হ্যানন ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী যুক্ত ছিল। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক তরুণ ব্যবসায়ীর মাধ্যমে তেল কেনার প্রক্রিয়াটি এগোয় বলে এফটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তখন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নানা বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল। ফলে লেনদেনের একটি বড় অংশ টেথার বা ইউএসডিটির মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাশিত অপরিশোধিত তেল অর্লেনের কাছে পৌঁছায়নি। এফটির অনুসন্ধান বলছে, প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে প্রায় পাঁচ লাখ ব্যারেল নিম্নমানের ফুয়েল অয়েল পাওয়া গেলেও মূল চুক্তির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ হয়নি। পরে অর্লেন চুক্তি থেকে সরে আসে।
বিষয়টি বর্তমানে পোল্যান্ডের ফৌজদারি তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ওয়ারশর আঞ্চলিক প্রসিকিউটর কার্যালয় গত আগস্টে জানিয়েছে, অর্লেন ও ওটিএসের সাবেক তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে পাঠানো হয়েছে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তিনটি প্রতিকূল তেল ক্রয়চুক্তির কারণে কোম্পানিগুলোর প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের দায় আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনো বাকি।
তদন্তে ওটিএসের সাবেক প্রধান সামের এ.-এর ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পোলিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, তাঁর বিষয়ে তদন্ত আলাদাভাবে অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সাবেক অর্লেন প্রধান দানিয়েল ওবায়েতেক নিজের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে দায় চাপানোর অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, পুরো ঘটনাটি পোল্যান্ডের আদালতে স্পষ্ট হওয়া উচিত। তাঁর দাবি, বর্তমান ব্যবস্থাপনা দ্রুত চুক্তি বাতিল না করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
অন্যদিকে বর্তমান অর্লেন কর্তৃপক্ষ সাবেক ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী টাস্কও ঘটনাটিকে সাবেক পিআইএস সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর বৃহত্তর সমালোচনার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে পিআইএস ও ওবায়েতেক এসব অভিযোগের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিরোধিতা করছেন।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস