প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সার্বিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। দেশটির আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে ছাত্র নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের কাছে পরাজয় স্বীকার করেছেন দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিচ। তাঁর এই ঘোষণার পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন শহরে বিজয়োল্লাসে মেতে ওঠেন আন্দোলনকারীরা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই পরাজয় মেনে নেন ভুচিচ। রাজধানী বেলগ্রেডে নিজ দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) সদর দপ্তরে তিনি জানান, প্রাথমিক ভোটের হিসাবেই তাঁদের পরাজয় স্পষ্ট হয়ে গেছে।
নির্বাচনে ছাত্র নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর সাফল্য সার্বিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ক্ষমতায় থাকা এসএনএসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে আন্দোলন করে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। যদিও ভুচিচ ও তাঁর দল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভুচিচের পরাজয় স্বীকারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বেলগ্রেডের রাস্তায় নেমে আসেন হাজারো মানুষ। অনেককে জাতীয় পতাকা হাতে আনন্দ করতে দেখা যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে আতশবাজি ফোটানো হয়। গাড়ির হর্ন বাজিয়ে এবং স্লোগান দিয়ে বিজয় উদযাপন করেন আন্দোলনকারীরা।
বেলগ্রেডের পাশাপাশি নোভি সাদসহ সার্বিয়ার অন্যান্য শহরেও উৎসব শুরু হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজয় উদযাপনের সময় এক শিক্ষার্থী সার্বিয়ার স্বাধীন হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন। অন্য একজন এই ফলাফলকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন।
যেভাবে ছাত্র আন্দোলনের সূচনা
সার্বিয়ার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
দেশটির নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। দুর্ঘটনাটি ঘিরে নির্মাণকাজের মান, সরকারি তদারকি এবং দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে।
ঘটনার জবাবদিহি চেয়ে প্রথমে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তী সময়ে সেই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নেয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। তাঁরা প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর দাবি জানান।
তবে ক্ষমতাসীন এসএনএস এসব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’
আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ সার্বিয়ার প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়।
এই আন্দোলনের কোনো একক প্রতিষ্ঠিত নেতা নেই। প্রার্থীদের মধ্যে চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, অভিনেতা এবং ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই আগে সরাসরি রাজনীতিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না।
জোটটির অন্যতম প্রধান প্রার্থী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া স্রদানভিচ।
বিবিসি সার্বিয়ানকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করার প্রত্যাশার কথা জানান।
আন্দোলনকারীদের নির্বাচনী কর্মসূচিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নিয়মভঙ্গকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশনের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটানোর দাবিও রয়েছে তাঁদের।
নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।
সার্বিয়ার নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট পড়েছিল ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর দেশটিতে এটি সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির একটি রেকর্ড।
সার্বিয়ার পার্লামেন্টে মোট ২৫০টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ১২৬ আসন।
প্রাথমিক ভোটের হিসাব অনুযায়ী, ছাত্র নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে এগিয়ে যায়। অন্যদিকে ভুচিচের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শিবির পিছিয়ে পড়ে।
তবে ভুচিচ যখন পরাজয় স্বীকার করেন, তখনো নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়নি।
আলেকসান্দার ভুচিচ দীর্ঘদিন ধরে সার্বিয়ার রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি।
তাঁর নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি ২০১২ সাল থেকে দেশটির ক্ষমতায় রয়েছে।
ভুচিচ এর আগে দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন।
২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়েছিলেন ভুচিচ।
নির্বাচনের আগে তিনি পেনশন ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভুচিচ সার্বিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষে অবস্থান নিলেও ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরোধিতা করেছেন।
এদিকে ছাত্র নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনী সাফল্য দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে নতুন সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে এবং আন্দোলনকারীদের সংস্কার কর্মসূচি কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার ওপর।
সূত্র: বিবিসি নিউজ।
মন্তব্যসমূহ