ইতালির বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। আগের সপ্তাহের সহিংসতা ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মিলানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামলেও মিলানে বড় ধরনের সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে রাজধানী রোম ও তুরিনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, শনিবার ইতালির মিলান, রোম ও তুরিনসহ কয়েকটি শহরে মূলত তরুণ-তরুণীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান, শিক্ষা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশ পায়।
গত সপ্তাহে মিলানে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ওই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার আগাম নিরাপত্তা জোরদার করে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতা প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা পাঠানো এবং সহিংসতায় জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান কঠোর করার উদ্যোগ রয়েছে।
মিলানে আগে থেকেই কয়েক শ সেনা মোতায়েন ছিলেন। শনিবার তাঁদের সঙ্গে আরও ৫০০ সেনা যুক্ত হন। তাঁরা শহরটিতে দায়িত্ব পালনরত প্রায় ৫ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে সহযোগিতা করেন।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, রেলস্টেশনে তল্লাশি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার উসকানি শনাক্ত করতেও নজরদারি চালায় কর্তৃপক্ষ।
দোকানপাটে বাড়তি নিরাপত্তা, রাজপথে হাজারো মানুষ
ইতালির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও আর্থিক কেন্দ্র মিলানে বিক্ষোভের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়।
শহরটির ফ্যাশন ডিস্ট্রিক্টে অবস্থিত ওমেগা, টিফানি ও গুচিসহ বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল দোকানের কাচের জানালা কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। অ্যাপল স্টোরও বন্ধ রাখা হয়। তবে শনিবার বিকেলের দিকে অধিকাংশ দোকান আবার খুলে দেওয়া হলেও অ্যাপল স্টোর বন্ধই ছিল।
সন্ধ্যার দিকে মিলানের রাস্তায় বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী জড়ো হন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মেলোনির বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি ‘রাষ্ট্রের মিথ্যাচার মানি না’ লেখা ব্যানার বহন করেন।
স্থানীয় টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়, একদল বিক্ষোভকারী ইতালির জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যালয়ের সামনে গোবর ফেলে প্রতিবাদ জানান। এ ছাড়া সরকারের সাফল্যের প্রচারসংবলিত প্রতীকী একটি বড় বিদ্যুৎ বিল পোড়ানো হয়।
তবে ব্যাপক জনসমাগম সত্ত্বেও মিলানের মূল বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে তিন কিলোমিটারের বেশি দূরে অবস্থিত মিলান পলিটেকনিকের সামনে গিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় মিছিল শেষ করেন আন্দোলনকারীরা।
এই বিক্ষোভে অংশ নেন মিলানের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেওয়া পিয়েরফ্রান্সেস্কো মাজোরিনো। তিনি ২০২৭ সালের শুরুর দিকে মধ্য-বামপন্থী জোটের প্রাইমারি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। শহরটির বর্তমান মেয়র জিউসেপ্পে সালা ২০১৬ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না।
আগের সহিংসতায় গ্রেপ্তার ৪৫ জন
মিলান পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আগের সপ্তাহে শহরটির কেন্দ্রীয় দুওমো স্কয়ারের আশপাশে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় প্রায় ২ হাজার তরুণ বিক্ষোভকারী জড়িত ছিলেন।
ওই সময় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বিভিন্ন দোকানে প্রবেশ করে স্নিকার্স, খেলাধুলার পোশাক ও অন্যান্য ক্রীড়াসামগ্রী লুট করেন।
দুই দিনের অভিযানে পুলিশ ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় জড়িতদের মধ্যে বিদেশি নাগরিক এবং ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীও ছিলেন।
শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মিলানে কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করা হয়েছে বলে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এদিকে ইন্টার মিলান ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত প্রায় ৩০ জন উগ্র ডানপন্থী ব্যক্তি অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভ এলাকায় উপস্থিত হন। তাঁরা অভিবাসী ও মুসলিমবিরোধী স্লোগান দেন। পরে পুলিশ তাঁদের অন্য বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়।
সেনাদের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো জানিয়েছেন, নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাদের সম্প্রতি হাত বাঁধার প্লাস্টিক ব্যান্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই অনুমতি কেবল রেলস্টেশনের আশপাশের নির্দিষ্ট এলাকার জন্য প্রযোজ্য।
সেনাদের পিপার স্প্রে কিংবা টেজার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
রোম ও তুরিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
মিলানে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও ইতালির অন্যান্য শহরে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
রাজধানী রোমে গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার সড়কগুলোতে চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সার্কাস ম্যাক্সিমাস ও পিয়াজ্জা দেল পোপোলোর আশপাশে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।
সেখানে কয়েকজন বিক্ষোভকারী ঐতিহাসিক কলোসিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁদের সরিয়ে দেন। অন্যদিকে যুদ্ধবিরোধী একটি মিছিলের অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে পিয়াজ্জা দেলা রিপাবলিকার কাছে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরে জলকামান ব্যবহারের মুখে বিক্ষোভকারীরা পিছু হটেন।
তুরিনেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে মিলানে আগের সপ্তাহের মতো ব্যাপক লুটপাটের পুনরাবৃত্তি হয়নি।
ইউরোপের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ
শনিবার শুধু ইতালি নয়, ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশের শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। স্পেনের মাদ্রিদ, পর্তুগালের লিসবন এবং আলবেনিয়ার তিরানাসহ বিভিন্ন শহরে মানুষ রাস্তায় নামেন।
এসব বিক্ষোভে শিক্ষা, দুর্নীতি, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান, পেনশনব্যবস্থা এবং আবাসনসংকটের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে সব দেশের আন্দোলনের দাবি এক নয়। ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করা হলেও অন্য দেশগুলোতে স্থানীয় সমস্যা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে।
ইতালির সরকার বাড়তি নিরাপত্তা ও কঠোর ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় ধরনের লুটপাট ঠেকাতে সক্ষম হলেও রোম ও তুরিনের সংঘর্ষ দেখিয়েছে, দেশটির বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি।
মন্তব্যসমূহ