অধিকৃত পশ্চিম তীরে দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করেছে ইসরাইল। হেবরন শহরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
হামলাকারী দুই ফিলিস্তিনি হেবরনের যে এলাকা থেকে এসেছেন, সেটি ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং পুরোপুরি বদলে দেওয়ার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে প্রস্তাবিত বড় সামরিক অভিযান কবে শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাননি তিনি।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হেবরনের বাইরে একটি চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও তিন সেনা। পরে ইসরাইলি বাহিনীর পাল্টা গুলিতে হামলাকারী দুজন নিহত হন।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হামলাকারীদের ব্যবহৃত গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাদের ধারণা, বন্দুকধারীরা কাছের রুট-৩৫ মহাসড়কে আরও বড় হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে পথে চেকপোস্টের মুখে পড়ায় তাঁরা সেখানে হামলা চালান।
বিবিসির যাচাই করা ভিডিওতে চেকপোস্টে ইসরাইলি সেনা ও বন্দুকধারীদের মধ্যে তীব্র গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে। আরেকটি ভিডিওতে দুই বন্দুকধারীকে গাড়ি থেকে নেমে পিস্তল ও অ্যাসল্ট রাইফেলের মতো অস্ত্র দিয়ে সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখা যায়। পরে ইসরাইলি সেনারাও পাল্টা গুলি চালান। সন্দেহভাজন এক হামলাকারীর ছবিও প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
এদিকে হেবরন ও কাছের হালহুল শহরের চারপাশে অবরোধ আরোপের কথা জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হেবরন শহরে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির উগ্র ডানপন্থি নেতারাও। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরে ‘গাজা কিংবা লেবাননের মতো’ অভিযান চালানোর দাবি তুলেছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরের শরণার্থীশিবিরগুলোতে আগে পরিচালিত সামরিক অভিযানের উদাহরণ টেনেছেন। ওই অভিযানগুলোতে আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।
ইসরাইলি বাহিনী এর আগেও ইসরাইলিদের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তবে ইসরাইলের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ হিসেবে সমালোচনা করেছে।
ঘটনাটি ইসরাইলের নির্বাচনী প্রচারণায়ও প্রভাব ফেলেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে প্রচারণা চালানো নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তাঁর দল লিকুদ পার্টি শুক্রবার সকালে নির্ধারিত প্রচারণামূলক কর্মসূচি বাতিল করবে।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে সরকারকে দুর্বল করার অভিযোগ তোলেন। ভবিষ্যতে দেশে কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে বিরোধী নেতারা ‘দায়ী’ থাকবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, নির্বাচনে এগিয়ে থাকা বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হামলাকারীদের হত্যা করা ব্যক্তিদের প্রশংসা করেছেন তাঁরা।
পশ্চিম তীরে উত্তেজনা এমনিতেই বাড়ছিল। বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে উগ্রপন্থি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে চার দিন পর ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ৯৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ চারজন নিহত হয়েছেন। তবে শুক্রবারের হামলায় নিহত দুই সেনাকে এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সূত্র: বিবিসি।
মন্তব্যসমূহ