রণক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় এক পা উড়ে যাওয়ার পর সংক্রমণ ঠেকাতে নিজের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছিলেন অন্য পায়ের পাতাও। এরপর শত্রুবেষ্টিত ‘কিল জোন’-এর একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের বয়লারের নিচের সরু গর্তে কেটে গেছে টানা আট মাসের বেশি সময়। চারদিকে সার্বক্ষণিক রুশ ড্রোনের টহল থাকায় যেখানে হেঁটে কিংবা গাড়িতে গিয়ে উদ্ধার করা ছিল সরাসরি মৃত্যুর শামিল, সেখান থেকেই ইউক্রেনীয় সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকোকে (৪৯) মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে শূন্যে ঝুলিয়ে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে একটি ভারী ড্রোন। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, পাঁচ বছর ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ইতিহাসে কোনো সেনাকে আকাশপথে ড্রোন দিয়ে ঝুলিয়ে উদ্ধার করার ঘটনা এটিই প্রথম।
গত ৪ অক্টোবর খারকিভ ফ্রন্টলাইনে এই রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযানটি পরিচালিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য ভ্লাসেনকো ২০২৩ সালের মে মাসে সম্মুখসারির অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ‘বাসকি’ ছদ্মনামের আরেক সহযোদ্ধা। দীর্ঘদিন মাটির বাংকারে কাটানোর পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংকারে পানি ঢুকে পড়লে তাঁরা পাশের একটি বিধ্বস্ত স্কুলে আশ্রয় নেন। কিন্তু বাইরে খাবার আনতে বের হলে রুশ ড্রোন হামলায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বাসকি এবং ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পরে ডান পায়ের হাড় বেরিয়ে এলে তিনি নিজের ছুরি দিয়ে সেই পায়ের পাতাও কেটে ফেলেন এবং কোনোমতে স্কুলে বয়লারের নিচের ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটারের একটি অন্ধকার গর্তে আশ্রয় নেন।
সম্মুখসারিতে ভ্লাসেনকোর অবস্থানের মোট মেয়াদ ছিল ৪৯১ দিন। এর মধ্যে শেষ আট মাস তিনি ওই ছোট্ট গর্তেই নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। পিকআপ ভ্যান কিংবা গ্রাউন্ড ড্রোন দিয়ে তাঁকে উদ্ধারের আগের সব চেষ্টা রুশ ড্রোন হামলায় ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে ইউক্রেনের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘গুরজুফ ডিফেন্স’-এর তৈরি ছয়টি প্রপেলারযুক্ত বিশেষ ভারী কার্গো ড্রোন ব্যবহারের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। ড্রোনটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন নিয়ে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম। অনাহারে ভ্লাসেনকোর ওজন ৭০ কেজিতে নেমে আসায় ড্রোন দিয়ে তাঁকে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৪ অক্টোবর নিয়মিত খাবারের চালানের সঙ্গে পাঠানো বিশেষ হারনেস ও উইঞ্চের সাহায্যে নিজেকে ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত করেন ভ্লাসেনকো। এরপর ড্রোনটি তাঁকে ২৩০ ফুট (৭০ মিটার) উঁচুতে তুলে নিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ ঘাঁটিতে পৌঁছে দেয়।
১৫ মিনিটের এই বিপজ্জনক যাত্রাপথে রুশ আক্রমণকারী ড্রোনকে বিভ্রান্ত করতে আরও তিনটি ডামি ড্রোন ওয়ান-ওয়ে মিশনে পাঠানো হয় এবং আশপাশের রুশ অবস্থানে একযোগে গোলাবর্ষণ করা হয়। খারকিভের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভ্লাসেনকো এই অবিশ্বাস্য উদ্ধারকে জীবনের দ্বিতীয় জন্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ