যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন কংগ্রেসীয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও চাপের মুখে ফেলতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা দীর্ঘায়িত করার কৌশল গ্রহণ করেছে ইরান। দেশটির জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আট মাস ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অবসান বা কূটনৈতিক অগ্রগতির কোনো রাজনৈতিক সুবিধা যাতে রিপাবলিকান প্রশাসন নির্বাচনের আগে ঘরে তুলতে না পারে, মূলত সে উদ্দেশ্যেই তেহরান এই কৌশলী অবস্থান বজায় রাখছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের গভীর আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ভাঙতে মার্কিন বাহিনী ও তাদের মিত্র ইসরায়েল যেকোনো সময় ফের নতুন করে সামরিক আঘাত হানতে পারে। ফলে কোনো তাড়াহুড়ো করে ভঙ্গুর চুক্তিতে পৌঁছানোর চেয়ে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে তেহরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সাফল্যের কৃতিত্ব দিতে চায় না ইরান।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপে ভোটারদের মাঝে ট্রাম্পের জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একাধিক জনমত জরিপেও এর নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে। তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাঈদ লেইলাজের মতে, কোনো সরাসরি বেআইনি পদক্ষেপে না জড়িয়ে কেবল আলোচনা বিলম্বিত করে এবং তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা জিইয়ে রেখেই ইরান অত্যন্ত কার্যকরভাবে মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে।
তবে এই আলোচনা থমকে থাকার পেছনে উভয় পক্ষের কঠোর শর্তাবলিও অন্যতম প্রধান দেয়াল হিসেবে কাজ করছে। ওয়াশিংটন শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি গুটিয়ে আনার শর্তে সংলাপ শুরু করতে চায়। অপরদিকে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, পরমাণু আলোচনার আগে তাদের দেওয়া ‘সাত দিনের পরিকল্পনা’র শর্তগুলো ওয়াশিংটনকে আগে বাস্তবায়ন করতে হবে।
কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো প্রস্তাব অনুযায়ী, সব শর্ত মানা হলে ইরান সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত রয়েছে; তবে নৌপথটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে তেহরানের হাতেই। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি রাষ্ট্রীয় তহবিল ছাড় এবং আঞ্চলিক সব সামরিক ফ্রন্টে সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি এখনো টেবিলে বহাল রয়েছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে আলোচনা দীর্ঘায়িত করার এই কৌশল ইরানের নিজস্ব অর্থনীতির ওপরও চরম আঘাত হানছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩.৬ শতাংশে। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নৌ অবরোধ দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির নিজস্ব মুদ্রা রিয়ালের দর প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ওয়াশিংটনের থিংকট্যাঙ্ক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেহরানের নেতৃত্ব ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা দেখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার গভীর সংকট এতটাই প্রকট যে, মার্কিন নির্বাচনের পরও যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ