ইউরোপের ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়াজুড়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও সামাজিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা ও শিক্ষক সংকট, কোথাও আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া ও তীব্র আবাসন সমস্যা, আবার কোথাও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাবকে কেন্দ্র করে রাজপথে নেমেছেন ক্ষুব্ধ তরুণরা। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন ইতোমধ্যে বৃহত্তর সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে এবং বেশ কয়েকটি দেশে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভয়াবহ সহিংসতায় পর্যবসিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশভিত্তিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও টিকে থাকার মৌলিক সংকট।
ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর থেকেই শ্রেণিকক্ষের জরাজীর্ণ অবস্থা, দীর্ঘ ক্লাসের সময় এবং কয়েক মাস শিক্ষক না থাকার প্রতিবাদে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরে এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়ে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানান। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তেলের বাজার অস্থির হওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। দেশটির শীর্ষ ট্রেড ইউনিয়ন সিজিটি মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধির দাবিতে এই আন্দোলনে সংহতি জানায়। সংকট কাটাতে সরকার ৩ হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধিত ফি বাতিলের ঘোষণা দিলেও উত্তেজনা কমেনি।
স্পেনে আবাসন সংকট চরম রূপ ধারণ করেছে। ৮৭ বছর বয়সি এক বৃদ্ধাকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং একটি বিনিয়োগ তহবিল কর্তৃক বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পর জনরোষ রাজপথে নেমে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পার্লামেন্টে ডানপন্থিদের বিরোধিতায় ভাড়াটে সুরক্ষা আইন পাস করাতে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগামী ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন।
প্রতিবেশী পর্তুগালেও রাজধানী লিসবনে ব্যাপক আবাসনবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে প্রায় ১২৪ শতাংশ, যা পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।
এদিকে ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিল দ্বিতীয় দিনে চরম সহিংসতায় রূপ নেয়, যেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অন্যদিকে আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে দুর্নীতি ও বেকারত্ববিরোধী বিক্ষোভ টানা ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। সেখানে উপকূলীয় এলাকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। সামগ্রিকভাবে সাশ্রয়ী বাসস্থান, উপযুক্ত শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিতের দাবিতে গোটা ইউরোপের তরুণ প্রজন্ম এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে নীতিনির্ধারকদের।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মন্তব্যসমূহ