ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

বিএনপির অতীতের সাফল্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন উদ্যোগের অনুপ্রেরণা

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করছে সরকার। এবার লক্ষ্য শুধু শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন শুরু করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।এই উদ্যোগে অতীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, বিএনপি সরকারের সময়ের কূটনৈতিক উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকার নতুন করে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছে।১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের তৎকালীন রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় দুই লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তির পর প্রত্যাবাসন শুরু হয় এবং জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, শেষ ব্যক্তি ১৯৭৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর মিয়ানমারে ফিরে যান। তবে প্রায় দুই লাখের পুরোটা নয়, জাতিসংঘের নথিতে ওই অভিযানে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ জনের প্রত্যাবাসনের তথ্য রয়েছে। এরপর ১৯৯১-৯২ সালে আবারও আড়াই লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। পরবর্তী সময়ে দুই লাখ ৩৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। এ সংখ্যাটিও আন্তর্জাতিক নথিতে পাওয়া যায়। এই অতীত অভিজ্ঞতাকেই বর্তমান উদ্যোগের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে সরকার। শামা ওবায়েদের বক্তব্য, শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নয়, প্রত্যাবাসন সফল করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও শক্তিশালী সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়ছে।তার ওপর আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়নও কমছে। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আশ্রয়সহ মৌলিক সেবা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।এই পরিস্থিতিতে সরকারের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গা সংকটকে অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যাবাসন শুরু করার মতো পরিবেশ তৈরিই এখন মূল লক্ষ্য।তবে এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি। রাখাইন রাজ্যে সংঘাত চলছে এবং সেখানে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মিরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে।এই কারণে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দুই পথেই যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।অন্যদিকে আগের সরকারের সময় বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে যে ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছিল, সেটি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলে বর্তমান সরকারের মূল্যায়ন।এবার তাই কৌশল আরও বিস্তৃত করতে চায় ঢাকা। জাতিসংঘের পাশাপাশি চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী অংশীদারকে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।এর মধ্যে চীনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের মতো আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকেও এই উদ্যোগে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তুরস্কসহ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সহযোগিতাও চাওয়া হচ্ছে।এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন। এর মধ্যে ছিল দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ, মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, জবাবদিহি জোরদার এবং আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো। পরের দিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বক্তব্যেও প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। অর্থাৎ সরকারের কূটনৈতিক বার্তায় এখন মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনকে আরও স্পষ্টভাবে কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।তবে বাস্তবতা সহজ নয়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইনে ক্ষমতার পরিবর্তন, নিরাপত্তাহীনতা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ার প্রশ্ন এখনো বড় বাধা।ফলে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ালেই দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু হবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই নেই।সরকারও বিষয়টি সহজ নয় বলে স্বীকার করছে। লক্ষ্য হচ্ছে একসঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজেদের দেশে ফিরতে পারেন।

বিএনপির অতীতের সাফল্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন উদ্যোগের অনুপ্রেরণা