মিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ করবে বাংলাদেশ
রাখাইন রাজ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা, সীমান্তপারের অপরাধ ও নিরাপত্তাঝুঁকির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রায় ১০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নিরাপত্তা বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা বেড়া নির্মিত হবে।সরকারি সূত্রের বরাতে নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে বেড়া নির্মাণ করা হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে কোন কোন এলাকায় বেড়া দেওয়া হবে, তা প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দৈর্ঘ্য ২৭১ কিলোমিটার বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে।[BANGVIEWS-POST:1945]গত মাসে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা দমনও এর অন্যতম লক্ষ্য।সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির কর্মকর্তাদের মতে, রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় মিয়ানমারের প্রচলিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মংডু দখলের পর আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।এর ফলে নাফ নদী ও দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তে নজরদারি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. শহিদুল হক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে সীমান্ত অতিক্রম করছেন বলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। একই পথে দেশে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের ঝুঁকিও বেড়েছে।[BANGVIEWS-POST:1944]তাঁর মতে, শুধু বেড়া নির্মাণ করলেই হবে না। সীমান্ত বেড়ার পাশাপাশি টহল সড়ক তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু করা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।তিনি বলেন, মিয়ানমার ২০০৯-১০ সালের দিকে নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্তে প্রায় ১২০ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে প্রায় ৭০ কিলোমিটার নির্মাণের পর কাজটি বন্ধ হয়ে যায়।বাংলাদেশের উচিত প্রথমে নাফ নদীসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং পরে নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবানের দুর্গম পার্বত্য সীমান্তে বেড়া নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়া বলে মনে করেন তিনি।বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে মংডু দখলের পর নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে অন্তত ৪২৬ বাংলাদেশি জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩২৪ জনকে দেশে ফেরানো সম্ভব হলেও বাকিরা এখনো আটক রয়েছেন।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরাকান আর্মির হাতে বাংলাদেশি জেলে আটকের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৭৩ জন এবং মে মাসে আরও ১৪ জেলেকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিযোগ, জেলেদের আটক করে মুক্তিপণ আদায় আরাকান আর্মির অর্থ সংগ্রহের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বেড়েছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থায়ী বেড়া, সীমান্ত সড়ক এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে। পাশাপাশি অনুপ্রবেশ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তাও জোরদার হবে।সূত্র: নিক্কেই এশিয়া